দিয়াবাড়ীর আকাশে খুব অল্প উচ্চতায় বিশাল আকারের একেকটি বিমান চলাচল করে থাকে। উচ্চতা এত অল্প থাকে যে, বিমানের জানালা-দরজা, সংস্থার নাম সবই স্পষ্ট দেখা যায়। এত কাছ থেকে বিমান উড়তে দেখে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন আগেও ব্যাপক আনন্দ ও হই-হুল্লোড় করত। সেই বিমানের শব্দই এখন যেন তাদের কাছে বিরাট আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মাইলস্টোন ক্যাম্পাসে ওই বিভীষিকাময় ঘটনা যারা দেখেছেন তাদের কাছে এটি এখন এক ভয়ানক ‘ট্রমা’।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) সরেজমিনে মাইলস্টোন স্কুল এলাকায় গিয়ে কথা বলে জানা যায় এমন পরিস্থিতির কথা। এদিন মাইলস্টোন ক্যাম্পাসটি সেনাবাহিনীর সদস্যদের তত্ত্বাবধানে থাকতে দেখা যায়। অনুমতি ছাড়া কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তবে নিখোঁজ কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। আলামত সংরক্ষণ ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাসদস্যরা সেখানে অবস্থান করছিলেন বলে জানা যায়।
মাইলস্টোন স্কুলের সামনে কথা হয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। সে জানায়, আকাশে বিমান দেখলেই এখন আতঙ্ক লাগে। মনে হয়, এই বুঝি মাথার ওপর পড়ল।
অপু নামের এক শিক্ষার্থী বলল একই কথা। সে বলে, এখানকার আকাশে খুব কাছ থেকে বিমান ওড়ে। আগে খুব মজা পেতাম। ওই দিনের ঘটনার পর ভয় লাগে।
পাশে থাকা এক অভিভাবক বললেন, ‘সেদিন আমি ঘটনাস্থলে এসেছিলাম। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। এখন বিমানের শব্দ শুনলেই ভয় লাগে। রাতে ঘুমাতে পারি না।’
গতকাল দেখা যায়, যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আহত, নিহত ও নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহে স্কুলের ৫ নম্বর ভবনে হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে। হেল্প ডেস্কে নিখোঁজদের তথ্য লিপিবদ্ধ করতে আসছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছিল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে উৎসুক জনতার ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার স্বার্থে স্কুলের প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয়। একই সঙ্গে অন্য চারটি ফটকও বন্ধ ছিল। আগের দিনের তুলনায় গতকাল কলেজের সামনে ভিড় কম ছিল। এরপরও উৎসুক জনতা অবস্থান করছিলেন। তবে পুরো ক্যাম্পাসটি বর্তমানে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। সেনাসদস্য ছাড়াও ভেতরে পুলিশ, র্যাব, আনসার ও গোয়েন্দা সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
প্রধান ফটকের সামনে ছিলেন স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস কে সোলাইমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানে অনুমতি ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বাইরে উৎসুক জনতা ভিড় করছেন। তারা যে কী দেখেন, আর কী খোঁজেন আমরা জানি না। তাদের বারবার অনুরোধ করছি, তারপরও সরেন না।’ তিনি বলেন, ‘যদি কেউ নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে আসেন, তাদের আমরা ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছি।’
নিখোঁজদের খুঁজতে এসে স্বজনদের আহাজারি
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মরিয়ম উম্মে আফিয়ার (৯) নিখোঁজের দাবি নিয়ে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে আসেন তার মা উম্মে তামিমা ও মামা সাব্বির।
সাব্বির বলেন, ‘ভাগ্নির শোকে আমার বোন পাগলপ্রায়। তিনি শারীরিকভাবে এতটাই অসুস্থ যে এখন ঠিকমতো কথা বলতেও পারছেন না। আমাদের বাসা তুরাগের চন্ডালভোগে।’
দুর্ঘটনার দিন স্কুলের নার্সারির শিক্ষার্থী রাবেয়াকে স্কুল থেকে নিতে এসেছিলেন তার মা হাসিনা ও সাত বছর বয়সী ভাই হাসান। বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আগুন লাগার পরপরই শুরু হয় হুড়োহুড়ি। পরে রাবেয়া ও মা হাসিনার সন্ধান মিললেও এখন পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া যায়নি হাসানের।
গতকাল হাসানের সন্ধানে আবারও স্কুলে ছুটে এসেছিলেন স্বজনরা। হাসানের খালাতো বোন সামিয়া ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার দিন হাসান তার মায়ের সঙ্গে স্কুলে এসেছিল। পরে মা ও বোনকে পাওয়া গেলেও হাসানের কোনো খোঁজ নেই। আমরা বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ করেছি, কোথাও তাকে পাইনি।’
কবে খুলবে স্কুল
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় হতাহত ও নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করে ঠিকানাসহ তালিকা প্রস্তুত করার জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন মো. মাসুদ আলম (উপাধ্যক্ষ-প্রশাসন), খাদিজা আক্তার (প্রধান শিক্ষিকা), লুৎফুন্নেসা লোপা (কো-অর্ডিনেটর), মনিরুজ্জামান মোল্লা (অভিভাবক), মারুফ বিন জিয়াউর রহমান (শিক্ষার্থী) ও মো. তাসনিম ভূঁইয়া (শিক্ষার্থী)।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কমিটির সদস্য ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষিকা খাদিজা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সকাল থেকেই আমাদের ৫ নম্বর ভবনে একটি বুথ বসানো হয়েছে। সেখানে নিখোঁজদের স্বজনরা এসে তথ্য দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত অনেকেই এসেছেন। পরে বিস্তারিতভাবে সব তথ্য প্রকাশ করা হবে।’
কবে নাগাদ প্রতিষ্ঠানটি খোলা হবে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষিকা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে এখানকার শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা আপাতত সম্ভব নয়। যখন আমরা পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারব, তখন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।’
যা বললেন সেনা কর্মকর্তা
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া সেনাবাহিনীর ৪৩ রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নের কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান গতকাল ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখানে দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রথম রেসপন্স টিম হিসেবে প্রবেশ করি এবং স্পটে প্রবেশ করার পরই দুটি লাশ দেখতে পাই। সম্ভবত একজন মা এবং তার ছেলের লাশ। আমরা এই লাশ দুটি বিবস্ত্র দেখার পরে মা এবং ওই শিক্ষার্থীকে সম্মান দেওয়াটা সবচেয়ে বেশি গর্বের মনে করেছি। আমার সঙ্গে ছিলেন সৈনিক আশিক, আমরা দুজনই ইউনিফর্ম খুলে মা ও ছেলের শরীর ঢেকে দিয়ে তাদের সম্মান রক্ষার চেষ্টা করি। সেনাবাহিনীর প্রত্যেকটা সদস্যের জন্য তার ইউনিফর্ম গর্বের বিষয়, সেই পোশাক দিয়ে তাদের সম্মান রক্ষা করি। এরপর আমরা উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করি। আমরা আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ করি এবং পরে ক্যাম্পে প্রত্যাবর্তন করি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এয়ারক্রাফটটা যে জায়গায় বিধ্বস্ত হয়েছে সেই জায়গায় আগুনের প্রজ্বালনটা বেশি ছিল, ঠিক সেখানেই দুটি লাশ পড়েছিল। সেটি আমরা স্পটে ঢুকে প্রথম দেখতে পাই। তখন থেকেই আমরা উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করি। আমরা এবং আমাদের সৈনিকরা, ভেতরে যারা তখনো জীবিত ছিল তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছি। অনেকাংশেই আল্লাহর রহমতে আমরা তাদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর ২৫ জন সৈনিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, কিন্তু ক্রিটিক্যাল পর্যায় কেউ নেই। বর্তমানে ১১ জন সৈনিক ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।’
ডিএনএ পরীক্ষায় পাঁচ শিশুর পরিচয় শনাক্ত সিআইডির
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহতদের মধ্যে পাঁচজন মেয়েশিশুর পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
এই পাঁচজন হলো ওকিয়া ফেরদৌস নিধি, মো. ফারুক হোসেন ও সালমা আক্তার দম্পতির কন্যা। লামিয়া আক্তার সোনিয়া, মো. বাবুল ও মাজেদা দম্পতির কন্যা। আফসানা আক্তার প্রিয়া, মো. আব্বাস উদ্দিন ও মোসা. মিনু আক্তার দম্পতির কন্যা। রাইসা মনি, মো. শাহাবুল শেখ ও মিম দম্পতির কন্যা। মারিয়াম উম্মে আফিয়া, আব্দুল কাদির ও উম্মে তামিমা আক্তার দম্পতির কন্যা।
সিআইডি জানিয়েছে, বাকি লাশ বা দেহাংশের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার কাজ অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধার হওয়া লাশের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, কেবলমাত্র ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেই সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
হতাহতের তালিকা প্রণয়ন, চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণে দাবি ঢাবির ২২ শিক্ষকের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, নিহতদের পরিবারের সবাইকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, আহতদের সুচিকিৎসাসহ সব সুবিধা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন বিভাগের ২২ শিক্ষক।
গতকাল সন্ধ্যায় ঢাবির গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ব্যানারে পাঠানো এক বিবৃতিতে ওই দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ এবং আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অন্যদের দ্রুত আরোগ্য কামনা এবং মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের ছাত্রদের ৬ দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করা হয়।
ঢাবির গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের পক্ষে বিবৃতি প্রদানকারী ওই শিক্ষকরা হলেন অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. মো. ওয়াহিদুজ্জামান, অধ্যাপক ড. হারুনর রশীদ খান, অধ্যাপক ড. আমিনুল হক ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা, অধ্যাপক ড. আ. ক. ম. জামাল উদ্দিন, অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ, অধ্যাপক ড. শবনম জাহান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজমল হোসেন ভূঁইয়া, অধ্যাপক ড. শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম খান, অধ্যাপক ড. সুব্রত সাহা, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, অধ্যাপক ড. রাফিউল ইসলাম, অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ, অধ্যাপক ড. জামিলা আহমেদ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. আফজাল হোসেন, অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রহমান, অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ, ড. মাহমুদুর রহমান, ড. বেলাল হোসেন এবং ড. মাহবুব আল মারুফ।