কবরস্থান ঠিক দর্শনীয় কোনো জায়গা নয়। তবে কিছু কিছু কবরস্থান তার স্বীয় বৈশিষ্ট্যে এত অনন্য যে, সেসব কবরস্থান দেখতে দর্শনার্থীরা মুখিয়ে থাকেন। তেমন কিছু কবরস্থানের খবরাখবর জানাচ্ছেন- মোহনা জাহ্নবী
বিখ্যাত কবরস্থান
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে মৃতের শহর নামে পরিচিত পের লা সেজ বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত একটি কবরস্থান। পৃথিবীর আর কোনো কবরস্থানে এত দর্শনার্থীর সমাগম হয় না, যা এই কবরস্থানে হয়। অবশ্য এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। এখানে শায়িত আছেন জগদ্বিখ্যাত লেখক, চিত্রশিল্পী, সংগীতজ্ঞসহ অনেকেই।
১৮০৪ সালে সম্রাট নেপোলিয়ন এই কবরস্থানটি উদ্বোধন করেন। কবরস্থানটির নামকরণ করা হয় রাজা চতুর্দশ লুইয়ের রাজকীয় পাদ্রি পিয়েরে ল্য সেজের নামে; যিনি নিজেও এখানে শায়িত আছেন। ১২০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এই কবরস্থানে ৩ লক্ষাধিক কবর আছে। তাই এখানে ঠিকভাবে ঘুরে দেখতে হলে একটা মানচিত্র সংগ্রহ করা জরুরি।
প্রকৃতিবেষ্টিত এই কবরস্থানের প্রতিটি কবরের স্থাপত্য ভিন্ন রকম সুন্দর। বিশ্বের অন্যতম সেরা রকস্টার জিম মরিসন, যিনি ১৯৭১ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্যারিসের একটি হোটেলে মারা যান, তার সমাধি আছে এখানে। এই সমাধিতেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় প্রতিদিন। মাঝে মধ্যে অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে প্রয়োজন পড়ে পুলিশি পাহারার। চুরির ঘটনাও ঘটেছে বহুবার। জিম মরিসনের সমাধিফলক চুরি হয়েছে কয়েকবার।
এখানে আছে ফরাসি চিত্রকর ইউজেন দেলাক্রয়ারের কবর, যার আঁকা চিত্রকর্ম ল্যুভর মিউজিয়ামসহ আরও বিখ্যাত কিছু মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম লেখক বালজাক, ফরাসি কবি গিয়ম অ্যাপোলোনিয়রের কবরও আছে এখানে। অ্যাপোলোনিয়রের কবর দেখতে এসে বেদনাবিধুর হয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গ কবিতাও লিখেছিলেন। এখানে আরও আছে বিশ্বের সুরের জগতের মহারাজা ফ্রেডরিখ শ্যাপারের সমাধি।
জগদ্বিখ্যাত আইরিশ লেখক অস্কার ওয়াইল্ড, যিনি সমকামের অভিযোগে জেল খেটেছিলেন, তারপর প্যারিসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং ৪৬ বছর বয়সে মারা যান, তার কবরও এখানে আছে। ইতালির বিখ্যাত চিত্রকর অ্যামোদিও মদিগ্লিয়ানি অসুখে ভুগে মারা যান মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, তার মৃত্যুর দুদিন পরেই তার প্রেমিকা গর্ভে সন্তান নিয়ে আত্মহত্যা করেন।
জীবিত অবস্থায় মাত্র একটি প্রদর্শনী করতে পেরেছিলেন তিনি, অথচ আজ বিশ্বজুড়ে তার কত নামডাক। সেই দুঃখী চিত্রকর অ্যামোদিও মদিগ্লিয়ানিও শায়িত আছেন প্যারিসের এই কবরস্থানে। দুঃসাহসী অভিযাত্রী, লেখক নাদার সবুজে ঘেরা এক সমাধিতে শুয়ে আছেন। মিসরীয় হায়ারোগ্লিফিক্সের পাঠোদ্ধারের জনক জ্য ফ্রাসোয়া চ্যামপোলিওনের সমাধি মহীরুহর মতো দাঁড়িয়ে আছে এখানে।
সর্ববৃহৎ কবরস্থান
ইরাকের নাজাফ শহরে জীবিত মানুষের সংখ্যা ১৩ লাখ, কিন্তু মৃত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখ! আর সেই ৫০ লাখ মানুষ শুয়ে আছে শহরটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে শান্তির উপত্যকা ওয়াদি আস-সালাম নামক কবরস্থানে। যার আয়তন ১০ বর্গ কিলোমিটার এবং এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবরস্থান। শুধু তাই নয়, এটি বিশ্বের প্রাচীন কবরস্থানগুলোর মধ্যেও একটি।
কথিত আছে, হজরত ইবরাহিম (আ.) তার পুত্র হজরত ইসহাক (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে একবার ইরাকের নাজাফে এসেছিলেন। সে সময় এই অঞ্চলে নিয়মিত ভূমিকম্প হতো। কিন্তু হজরত ইবরাহিম (আ.) যতদিন এখানে অবস্থান করেছিলেন, ততদিন কোনো ভূমিকম্প হয়নি। এক রাতে ইবরাহিম (আ.) পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে গেলে সেদিনই আবার ভূমিকম্প হয়। তখন নাজাফের এলাকাবাসী তাকে অনুরোধ করেন সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য। কিন্তু তাদের অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের সন্তুষ্ট করতে হজরত ইবরাহিম (আ.) সেখানে জমি কেনেন। সেই জমিই বর্তমানে ওয়াদি আস-সালাম কবরস্থান।
হজরত আলি (রা.)-এর মাজারের পাশেই অবস্থিত হওয়ায় কবরস্থানটি শিয়াদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। অনেকেই মৃত্যুর পর এখানে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।
প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে মৃত আত্মীয়-স্বজনদের কবর দেওয়ার জন্য। এখানে সমাহিতরা প্রধানত ইরাকি হলেও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকেও মানুষ এখানে আসে কবর দেওয়ার জন্য।
এই কবরস্থানের অধিকাংশ কবরই মূলত পোড়ামাটির ইটের তৈরি। অধিকাংশ কবরে পবিত্র কোরআন শরিফের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি খোদাই করা আছে। ব্যক্তিগত একক কবরের বাইরে কিছু আছে পারিবারিক সমাধি, যেগুলোর ওপরে সাধারণত গম্বুজ থাকে। কিছু ভূগর্ভস্থ সমাধিও আছে, যেখানে মইয়ের সাহায্য প্রবেশ করতে হয়। এই সমাধি কক্ষগুলোর প্রতিটিতে ৩০ থেকে ৫০ জনের মরদেহ কবর দেওয়া সম্ভব।
এই কবরস্থান বর্তমানে ইউনেসকোর টেন্টেটিভ লিস্টে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। হয়তো একদিন এটি ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে!
উঁচু কবরস্থান
পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু কবরস্থানটির উচ্চতা ১৪ তলা; যার অবস্থান ব্রাজিলের সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের সান্তোস শহরে। এই কবরস্থানটি গিনেজ বুকেও জায়গা করে নিয়েছে।
সান্তোস শহরের ফুটবল ক্লাবে পেলে, নেইমারের মতো কিংবদন্তি খেলোয়াড়রা খেলেছেন। তাই শহরটি এমনিতেই আলোচিত। তার ওপর সেখানে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু কবরস্থান। পেলে; জীবনের বেশির ভাগ সময় যে শহরের ফুটবল ক্লাবে খেলেছেন, সেই সান্তোস শহরের এই কবরস্থানেই তাকে সমাহিত করা হয়েছে।
কবরস্থানটির নাম ‘মেমোরিয়াল নেক্রোপোলে কুমেনিকা’। ১৯৮৩ সালে পেপে আসতুত নামের এক আর্জেন্টাইন ব্যবসায়ী এই কবরস্থান তৈরি করেন। তৈরির আট বছর পরই গিনেজ বুকে স্থান পায় এটি।
কবরস্থানের ভবনটি লম্বায় প্রায় ৩০৫ ফুট উঁচু। এতে আছে প্রায় ১৪ হাজার লম্বা আয়তাকার চেম্বার, যার ভেতরে লাশবাহী কফিন রাখা হয়। কবরস্থানটিতে একটি শ্মশানও আছে। ভবনটির অভ্যন্তরে একটি বাগান আর কৃত্রিম জলপ্রপাতও তৈরি করা হয়েছে। কবরস্থান হলেও এতে আছে একটি গাড়ির জাদুঘরও!
তারেক
.jpg)