নায়ক রাজ রাজ্জাক অভিনীত ‘যে আগুনে পুড়ি’ সিনেমার জনপ্রিয় ‘চোখ যে মনের কথা বলে’ গানটির কথা মনে আছে? আসলেই কি চোখ মনের কথা বলতে পারে? সাইকোলজি বা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় হয়তো পারে কিন্তু চোখ মনের কথা বলতে পারুক আর না পারুক আপনার হাতের লেখা আপনার সম্পর্কে অনেক কথাই বলে দিতে পারে। বিজ্ঞানে যাকে বলা হয় গ্রাফোলজি। আধুনিক বিজ্ঞানে যাকে নিউরোসায়েন্স বলা হয় যদিও সায়েন্স তকমা দেওয়া নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক আছে।
যারা আগে থেকে ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত নন তাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে ‘বলা নেই কওয়া নেই এ আবার কোন বিজ্ঞান?’ কিন্তু আপনি হয়তো জেনে অবাক হবেন যে, এটি হাজার বছরের পুরোনো একটি কৌশল। শত শত বছরের হাতের লেখা গবেষণার ফসল আজকের এই গ্রাফোলজি।
গ্রাফোলজি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে। গ্রাফ অর্থ লেখা আর লোজি অর্থ বিশ্লেষণ। গ্রাফোলজি অর্থ হস্তলেখা বা হাতের লেখা বিশ্লেষণ।
গ্রাফোলজির ইতিহাস অনেক পুরোনো। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীতে চীনা দার্শনিক কুও জো সু একটি মহামূল্যবান উক্তি করেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে হাতের লেখা দাও, আমি বলে দেব সেটা মহান ব্যক্তির না অমার্জিত ব্যক্তির।’ গ্রাফোলজি নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীর গবেষণা থাকলেও ১৬২২ সালে ইতালির প্রফেসর ড. ক্যামিলো বাল্ডি তার বই প্রকাশের মাধ্যমে গ্রাফোলজিকে সংগঠিত করেন।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আমরা যখন কিছু লিখি তা মূলত নির্দেশনা আসে মস্তিষ্ক থেকে, যার ফলে আপনার মস্তিষ্কের মধ্যে যা ঘুরপাক খাচ্ছে তার একটা প্রতিফলন ঘটে লেখার মাধ্যমে। গ্রাফোলজি গবেষকদের মতে নির্দিষ্ট কিছু আচরণের মানুষের মধ্যে একই রকমের লিখার ধরনের মিল থাকে। যেমন- ইংরেজি ছোট হাতের t-এর ক্রস যারা একদম উপরে দেয় তারা মূলত উচ্চাভিলাষী এবং সবকিছুতে আশাবাদী হয়ে থাকে। তাদের আত্মসম্মানবোধ অন্যদের তুলনায় একটু বেশি হয়। আবার যাদের ইংরেজি হাতের অক্ষর a, o-এর মুখ খোলা থাকে তারা একটু বাঁচাল প্রকৃতির হয়ে থাকে। আবার যাদের ইংরেজি d বর্ণের লুপ (d-এর উপরের গোলাকার অংশটিকে লুপ বলা হয়) বেশি তারা সমালোচনা নিতে পারেন না।
হাতের লেখার কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন- Margin, Baseline, Slant, Size, Pastocity, Connection, Spacing, Zones, Pressure, Speed, Individual Letters ইত্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আপনি অতীত, পরিবার ও ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে কতটুকু ভাবেন তা নির্ণয় করা সম্ভব। কেউ কতটুকু আবেগপ্রবণ বা বাস্তববাদী তাও হাতের লেখা দেখে বলা সম্ভব। এই রকম একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের অনেকগুলো বিষয় ইনট্রোভার্ট না এক্সট্রোভার্ট, রাগী না শান্ত, সত্যবাদী না মিথ্যাবাদী, ধৈর্যশীল না অধৈর্যশীল ইত্যাদি গ্রাফোলজির মাধ্যমে জানা সম্ভব।
গ্রাফোলজি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিচে এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার উল্লেখ করা হলো-
১. মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থান
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় গ্রাফোলজি, বিশেষত যখন কোনো প্রার্থীচাকরির জন্য উপযুক্ত কি না, তা মূল্যায়ন করা হয়। হাতের লেখার মাধ্যমে প্রার্থীর মনোভাব, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা এবং মানসিক গঠন বোঝা যায়।
২. শিক্ষা ও ক্যারিয়ার পরামর্শ
ছাত্রছাত্রীদের হাতের লেখা বিশ্লেষণ করে তাদের মানসিক প্রবণতা, শক্তি এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করা যায়। এর মাধ্যমে সঠিক পেশা বা শিক্ষার দিক নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য এবং থেরাপি
মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ডিপ্রেশন ইত্যাদি মানসিক অবস্থা বোঝার জন্য গ্রাফোলজি ব্যবহার করা হয়। এটি একজন ব্যক্তির আবেগীয় অবস্থা এবং মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
৪. ফরেনসিক এবং তদন্ত (ফরেনসিক গ্রাফোলজি)
অপরাধ তদন্তে ফরেনসিক গ্রাফোলজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো নথি বা চিঠি আসল কি না বা অপরাধীর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা বিশ্লেষণ করা যায়।
৫. ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন
ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আত্মোন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রাফোলজি ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ব্যক্তির চিন্তাভাবনা, আবেগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেয়।
৬. ব্যক্তিগত উন্নতি
নিজের লেখার ধরন বিশ্লেষণ করে আচরণগত পরিবর্তনের চেষ্টা করা যায়। এর মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। হাতের লেখা শুধু শব্দ নয় বরং আমাদের মনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি। আপনি যদি এই গ্রাফোলজি বিদ্যা সম্পর্কে জানতে চান তাহলে একজন দক্ষ গ্রাফোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে গ্রাফোলজি কোর্স করতে পারেন।
লেখক: গ্রাফোলজিস্ট ও ফরেনসিক ডকুমেন্ট এক্সামিনার
তারেক
.jpg)
.jpg)