গ্রিসের জাতীয় পুরাতত্ত্ব জাদুঘর- সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ জাদুঘরগুলোর ভেতর একটি। গ্রিক সভ্যতার সেরা পুরাকীর্তিগুলো এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। জাদুঘরটি ১৮৬৬ থেকে ১৮৮৯ সালের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল। পরে ১৯২৫-৩৯ সাল পর্যন্ত এটিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে রূপ দান করা হয়।
জাদুঘরটির প্রাথমিক নাম ছিল সেন্ট্রাল মিউজিয়াম। ১৮৮১ সালে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী চ্যারিলাওস ট্রাইকোপিস এটির বর্তমান নামকরণ করেন। জাদুঘরটিতে এত বেশি নিদর্শন আছে যে, শুধু মূল্যবান নিদর্শনগুলো হালকাভাবে চোখ বুলিয়ে দেখতে চাইলেও পুরো একটা দিন যথেষ্ট নয়!
এই জাদুঘরের সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শনগুলোর একটি হচ্ছে তথাকথিত আগামেমননের সোনার মুখোশ। মুখোশটি ট্রয় নগরীর একজন আবিষ্কারক হাইনরিখ স্লিম্যান ১৮৭৬ সালে মাইসিন নামক এলাকায় আবিষ্কার করেন। আগামেমনন ছিলেন বিখ্যাত গ্রিক রাজা; যার নেতৃত্বে গ্রিকরা ট্রয় নগরী আক্রমণ করেছিলেন। পরে জানা যায়, মুখোশটি ৩ হাজার ৭০০ বছরের পুরোনো, যা ট্রয়ের যুদ্ধেরও কয়েক শতক আগে। তাই মুখোশটি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তবে মুখোশটি আগামেমননের মুখোশ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে।
জাদুঘরটিতে স্বর্ণের তৈরি অনেক প্রাচীন নিদর্শন, ছুরি, বিভিন্ন ধরনের তরবারি, তীরের ফলা, গহনা, পানপাত্র ইত্যাদি রয়েছে। হাইনরিখ দাবি করেছিলেন, পানপাত্রটি মহাকবি হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াডে বর্ণিত পিলোসের রাজা নেস্টরের।
গ্রিসের বিভিন্ন দ্বীপ থেকে আনা অনেক নিদর্শন স্থান পেয়েছে জাদুঘরটিতে। রয়েছে মৃৎপাত্রের বিশাল সংগ্রহ। পাত্রগুলোতে আজও অম্লানভাবে ফুটে আছে গ্রিক পুরাণের কল্পকথা, তৎকালীন জীবনধারা, পশুপাখির অবয়ব ইত্যাদি। কিছু কিছু পাত্র আকারে বেশ বড়। পাত্রগুলো খুব আকর্ষণীয়।
জাদুঘরে আরও আছে ৩ হাজার বছরের পুরোনো বাথটাব, হাড়ের তৈরি শিরস্ত্রাণ, বর্ম, আড়াই হাজার বছরের পুরোনো বিশালাকার ব্রোঞ্জ দেবতা মূর্তি। সবগুলো নিদর্শনের সঙ্গে সুন্দর করে বর্ণনা দেওয়া আছে। সেসব বর্ণনা পড়ে নিদর্শনগুলো সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সব তথ্য পাওয়া যায়। ব্রোঞ্জের মূর্তিটি দেবরাজ জিউসের নাকি সাগর দেবতা পসাইডেনের তা নিয়ে এখনো কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি, তবে গবেষণা চলমান। ভাস্কর্যটি এত জীবন্ত, দেখলে মনে হবে একজন মানুষই যেন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাগরের গহীন তল থেকে উদ্ধার করা ২ হাজার বছর আগের অ্যান্টিকিথেরা দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। অতি প্রাচীন হওয়ায় এবং সাগরতলে দীর্ঘদিন থাকায় সেটির অবস্থা ছিল খুব করুণ। পরে যতটা সম্ভব অবিকৃত রেখে সূক্ষ্মভাবে তা মেরামত করা হয়েছে।
২ হাজার ২০০ বছর আগের ‘আর্তেমিসের অশ্বারোহী’ নামের একটি বিশাল ভাস্কর্যও আছে এখানে। দেখলে মনে হবে, ঘোড়াটি দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছে আর তাতে সওয়ার এক ছোট্ট বালক। আরও আছে অর্ধেক ষাঁড়, অর্ধেক মানুষ এর অদ্ভুত ভাস্কর্য।
জাদুঘরে যে শুধু গ্রিক সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে তা নয়, মিসরীয় সভ্যতারও বেশ সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে। কিছু সুন্দর মমি আছে। ৩ হাজার বছরের পুরোনো একখণ্ড রুটি আছে, রুটির একটি অংশ কামড় দিয়ে ছিঁড়ে নেওয়া।
স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল খুঁড়ে এত অমূল্য সব নিদর্শন জোগাড় করে কীভাবে এমন মহামূল্যবান একটি সংগ্রহশালা তৈরি করা সম্ভব হলো, তা দর্শনার্থীদের রীতিমতো ভাবিয়ে তোলে!
তারেক
.jpg)
.jpg)