মহাসাগরের অতল গহ্বরে লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর সব রহস্য। যদিও বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা সমুদ্রবিজ্ঞানে অনেক দূর এগিয়েছি। তবু অনেক বিষয় রয়েছে যার রহস্যের পর্দা আজও উন্মোচিত হয়নি।
সত্যিকার অর্থে সমুদ্রের বিষয় নিয়ে গবেষণার পরিমাণ অনেকটাই কম। যার কারণে সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানের গভীরতা মাপতে সক্ষম হলেও মানুষ এখনো সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে সমুদ্রের তল আমাদের কাছে হয়ে আছে বিস্ময়কর এক রহস্য। বিজ্ঞানী বা গবেষকরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও মাঝে মাঝে সমুদ্রের নানা রহস্যের সম্মুখীন হয়েছেন।
তেমনই এক রহস্যের সাক্ষী হয়েছিলেন জাপানের একজন পুরোহিত। নাম হিরোইউকি আরাকাওয়া। শুধু পুরোহিতই নন; সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত ডুবুরি। হিরোইউকি জাপানের তাতেয়ামা উপসাগরে একটি ডুবন্ত উপাসনালয় বা মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। ৩০ বছরের বেশি সময় তিনি প্রতিদিন পানির নিচে গিয়ে সেই মন্দিরে ঘণ্টা বাজাতেন।
এর মধ্যেই তার সঙ্গে একটি মাছের পরিচয় হয়। সেই মাছটি প্রথম প্রথম খুব স্বাভাবিক আর দশটা মাছের মতোই ছিল। হিরোইউকি যখন মন্দিরে যেতেন মাছটি তার সঙ্গে প্রতিদিনই দেখা করতে আসত। বেশ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুজনের। হিরোইউকি মাছটির নাম দেন ইয়োরিকো। নাম ধরে ডাকলেই হাজির হয়ে যেত মাছটি।
এসব অবশ্য ৩০ বছর আগের ঘটনা। তবে সময় যতই এগোতে যাতে ইয়োরিকো নামের মাছটি বড় হতে থাকে। একসময় দেখা গেল, মাছটির মাথা ফুলে উঠে একেবারে বিকট আকার ধারণ করেছে। আগের চেহারার সঙ্গে কোনো মিলই ছিল না তার। এমনকি প্রথমে নারী মাছ হলেও পরে সে পুরুষ হয়ে ওঠে।
এই অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হন হিরোইউকি। তবে এ মাছ প্রথম নজরে আসে বিবিসি আর্থের একটি ডকুমেন্টারি তৈরির সময়। জাপানের সাডো দ্বীপের কাছে পানিতে চিত্রগ্রহণের সময় বিবিসি আর্থ ক্রুদের ক্যামেরায় রূপান্তরটি ধরা পড়লে প্রজাতিটি মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০১৭ সালে এ পর্বটি প্রচারিত হয়েছিল।
যে মাছটির কথা এতক্ষণ বলছিলাম তার আসল নাম হচ্ছে এশিয়ান শিপসহেড র্যাসে। প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গের অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে মাছটি। জাপানে এটি কোবুদাই নামেও পরিচিত। এরা মূলত পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের স্থানীয়, কোরিয়ান উপদ্বীপ, চীন, জাপান এবং ওগাসাওয়ারা দ্বীপপুঞ্জের চারপাশে পাথুরে প্রাচীর অঞ্চলে বাস করে।
প্রজাতিটির পুরুষদের শারীরিক গড়ন নারী মাছের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। অন্যান্য প্রজাতির মাছের বৈশিষ্ট্য এদের মধ্যে প্রায় ১৫ আনাই বিদ্যমান। এর মোট দৈর্ঘ্য ১০০ সেমি (৩৯ ইঞ্চি) হতে পারে। এই প্রজাতির রেকর্ড করা সর্বাধিক ওজন হলো ১৪.৭ কেজি (৩২ পাউন্ড)।
এ মাছের স্বাদ অনেকটা ঝিনুকের মতো। জাপানে এই মাছের চাহিদা অনেক। তবে এই প্রজাতির মাছের ফোলানো মাথা আর লম্বা চোয়াল এক এলিয়েনের রূপ দিয়েছে এদের। এদের দাঁত দেখতেও বেশ ভয়ংকর। একেবারে সাজানো গোছানো পরিপাটি ছোট ছোট দাঁত নয়। আকারে বড় এবং বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখেই এদের দাঁত গজায়। যা দেখে রীতিমতো গা ছমছম করবে আপনার।
কোবুদাই পৃথিবীর আদিম মাছদের মধ্যে অন্যতম। কোরাল মাছ অধ্যুষিত সামুদ্রিক অঞ্চলেই এদের বসবাস। এই প্রজাতির নারী মাছেরা পুরুষ মাছের তুলনায় আকারে ছোট। শারীরিক গড়নও অন্যান্য সাধারণ মাছের মতোই। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, প্রতিটি পুরুষ মাছের উত্থান ঘটে নারী মাছের থেকেই। তবে বিস্ময়কর পরিবর্তনটি কীভাবে সম্ভব তা নিয়ে গবেষকরা গবেষণা করে পার করছে দিনের পর দিন।
গ্রীষ্মের তাপমাত্রা চরমে পৌঁছালে, কোবুদাই প্রজননে মেতে ওঠে। প্রতিটি পুরুষ মাছ একটি নির্দিষ্ট এলাকা দখল করে রাখে। দখল করা প্রতিটি নারী মাছই তার অনুগত। পুরুষ মাছটি তার এলাকার সব নারী মাছের সঙ্গেই মিলনের সুযোগ পায়। এই অঞ্চলে অন্য কোনো পুরুষ মাছের ঢোকার অনুমতি নেই।
তবে কোনো নারী মাছের বয়স ১০ পেরোলেই সে মিলনে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ এই সময় তার শরীরের নাটকীয় এক পরিবর্তন শুরু হয়। দেহে নারী হরমোনগুলো নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে পুরুষ হরমোন সঞ্চালন হতে শুরু করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তার মাথা এবং থুতনি ফুলে ওঠে। নারী মাছটি পরিণত হয় এক দাপুটে পুরুষে।
এই পরিবর্তন কোবুদাই রাজ্যে এক মল্লযুদ্ধের সূচনা করে। নতুন পুরুষ বয়স্ক পুরুষ মাছটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কারণ একটি অঞ্চলে একটি পুরুষই রাজত্ব করতে পারে। মাথা যত বড় প্রতিপক্ষ ভয় দেখানো তত সহজ। সম্মুখযুদ্ধে জয় পরাজয়ের মধ্যে দিয়েই রাজ্যের অধিপতি নির্ধারিত হয়। সব অধিকার ছেড়ে পরাজিত পুরুষ মাছটি প্রস্থান করে।
কোবুদাই রাজ্যে কোনো পুরুষেরই ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত নয়। কারণ প্রতিটি নারীর অভ্যন্তরেই একেকটি দাপুটে পুরুষের বাস। সময়ের পরিক্রমায় যার আত্মপ্রকাশ ঘটে।
এমনকি স্বাভাবিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোবুদাই মাছ পুরুষ হয়েই বেঁচে থাকে। এভাবেই চলতে থাকে যুগের পর যুগ। ইন্টারনেট অবলম্বনে
তারেক
.jpg)
.jpg)