যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ দিন হচ্ছে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’। এই শব্দটির সঙ্গে এখন কম-বেশি সবাই পরিচিত। কারণ, এই বিশেষ দিনে বিভিন্ন ব্র্যান্ড, শোরুম, ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে অনলাইনের পেজগুলো তাদের পণ্যে ডিসকাউন্ট দিয়ে থাকে। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের অনেকেই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকার পাশাপাশি বাঙালিরাও এই উৎসব পালন করছেন নানাভাবে। বিশেষ করে কেনাকাটায়।
‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ সেল সর্বপ্রথম আমেরিকায় শুরু হয়েছিল। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি এশিয়া মহাদেশ, এমনকি বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলের বিশাল ছাড়ে মানুষ প্রচুর কেনাকাটা করে থাকেন। এ সময় অনেকের এত বেশি বিক্রি হয়, যা সারা বছরেও হয় না।
তবে এই যে ঘটা করে পালন হচ্ছে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’, এর পেছনের ইতিহাস জানেন কি? কোথা থেকে এল এই ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ দিবস, কেনই-বা শুরু হয়েছিল এই দিন পালন। চলুন, জেনে নেওয়া যাক এর পেছনের ইতিহাস।
মূলত যুক্তরাষ্ট্রে ‘থ্যাংকসগিভিং’-এর ঠিক পরই ব্ল্যাক ফ্রাইডের বিক্রি শুরু হয়। অর্থাৎ এই দিন থেকে আপনি ক্রিসমাসের কেনাকাটা শুরু করতে পারেন। ‘থ্যাংকসগিভিং’ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নবান্ন উৎসব। এই দিনটি পালিত হয় নভেম্বরের শেষ বৃহস্পতিবার এবং নভেম্বর মাসের শেষ শুক্রবারে পালিত হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে।
১৮৬৯ সালে প্রথম আমেরিকায় শুরু হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেল। সে বছর আমেরিকায় দেখা দেয় ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা। বিশেষ করে ২৪ সেপ্টেম্বর মার্কিন সোনার বাজারে বিপর্যয় দেখা দেয়। ব্যবসায়ীরা একের পর এক লোকসান গুনতে গুনতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তখন তারা এমন একটি দিনের কথা ভাবছিলেন, যেদিন সব পণ্যে থাকবে বিশেষ ছাড়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নভেম্বরের শেষ শুক্রবার হবে সেই দিন।
আমেরিকায় ১৮৬৯ সালের শেষ শুক্রবার দিনটিকে বলা হয় ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’। দেখা যায়, এদিন যে পরিমাণ বিক্রি হয়, তাতেই অর্থনৈতিক সূচক একলাফে অনেক উপরে উঠে যায়। এখানে ব্ল্যাক বা কালো শব্দটি নেতিবাচক হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। সে সময় হিসাবের খাতায় লোকসানের হিসাব লেখা হতো লাল কালিতে এবং লাভের হিসাব কালো কালিতে লেখা হতো। তাই ব্ল্যাক ফ্রাইডেতে যেহেতু লোকসানের হিসাব বন্ধ করে কালো কালিতে লাভের হিসাব লেখা শুরু হয়, এ জন্য এই দিনটিকে বলা হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে।
অন্য দিনগুলোতে দোকানপাট সকাল ৬টায় খোলা হলেও এই দিন খোলা হতো ভোর ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে। ২০১১ সালে অনেক জনপ্রিয় দোকান খোলা হয়েছিল মধ্যরাতে। এটিই ছিল প্রথমবার, যেখানে মধ্যরাতে ক্রেতাদের জিনিস কেনার জন্য দোকানপাট খুলে দেওয়া হয়েছিল। এই দিনটিতে পুরো আমেরিকায় এত পরিমাণ বেচাকেনা হয় যে, আমেরিকার অর্থনীতির সূচক একলাফে অনেকখানি এগিয়ে যায়।
.jpg)
বর্তমানে জামাকাপড় থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলে কেনাবেচা হয়। তবে ১৮ শতকে ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলে মূলত বিক্রি হতো ক্রীতদাস। আমেরিকায় তখন প্রকাশ্যে বাজারে হাঁকডাকে বিক্রি করা হতো ক্রীতদাস-দাসীদের। যেহেতু তখন চলছিল অর্থনৈতিক মন্দা, তাই ক্রীতদাস কেনার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন আমেরিকানরা।
বছরের শেষ সময় দাস-দাসীর বেশি প্রয়োজন হতো। কারণ অক্টোবর মাসের শেষ দিনে হ্যালোইন, নভেম্বর মাসে থ্যাংকসগিভিং, ডিসেম্বরে বড়দিন পেরিয়েই নতুন বছরের প্রস্তুতি। এসব উৎসবের তোড়জোড় করার জন্য ধনীদের অনেক কাজের লোকের প্রয়োজন হতো। এ সময় যেহেতু নবান্ন উৎসব থাকে, ফসল ঘরে তোলার জন্য অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন। এ জন্য নভেম্বর মাসের শেষ শুক্রবার আমেরিকার প্রায় সর্বত্রই বসত একটা বিশেষ হাট। দাস বেচাকেনার হাট। তাই ব্যবসায়ীরা এই দিন ছাড়ে ক্রীতদাস বিক্রি করতেন।
১৯৫০-এর দশকে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় ব্ল্যাক ফ্রাইডের দিন ঘটেছিল আরেক ঘটনা। এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে বছরের সবচেয়ে বেশি লেনদেন হতো এবং ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হতো। ফলে শহরের রাস্তাজুড়ে থাকত প্রচুর মানুষ, দেখা দিত প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। এত মানুষের জমায়েত ও ট্রাফিক সামলাতে বেশ বেগ পেতে হতো ফিলাডেলফিয়ার পুলিশদের।
এমনকি এই দিনে বিশেষ ছাড় থাকার কারণে দেশের জনগণ সস্তায় জিনিস কেনার জন্য সেখানে এমন ভিড় করেছিল যে, সে দেশের পুলিশকে নাওয়া-খাওয়া ফেলে ভিড় সামলাতে হয়েছিল। সেই থেকেই ফিলাডেলফিয়ার পুলিশরাই এই দিবসের নাম দিয়েছিলেন ব্ল্যাক ফ্রাইডে। নিউইয়র্ক টাইমস ১৯৭৫ সালের ২৯ নভেম্বর দিনটিকে ‘বছরের ব্যস্ততম কেনাকাটা এবং ট্রাফিকের দিন’ হিসেবে উল্লেখ করে।
ক্যালিফোর্নিয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু জায়গায় এ দিনটিকে সরকারি কর্মচারীদের ছুটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ছুটি ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও থ্যাংকসগিভিং দুই দিনই হয়ে থাকে।
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)