সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড হলো একটি সাবমেরিন ক্যানিয়ন, যা মূলত বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত একটি গভীর সমুদ্রখাদ। এর অবস্থান সুন্দরবনের দুবলার চর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে এবং এটি বাংলাদেশের অন্যতম গভীর সামুদ্রিক অঞ্চল।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড পৃথিবীর ১১তম গভীর সমুদ্রখাদ। অনেকে দাবি করেন মারিয়ানা ট্রেঞ্চের পর এটিই পৃথিবীর দ্বিতীয় গভীরতম স্থান।
বঙ্গোপসাগরের অতল জলে লুকিয়ে থাকা এক রহস্যময় জগৎ ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’। এর নামটিও একরকমের ভয় ও কৌতূহলের জন্ম দেয়। ‘No Ground’ অর্থাৎ কোনো ভূমি নেই এমন একটি জায়গা যেখানে হঠাৎ করেই সমুদ্রের তলদেশ নেমে গেছে এক বিরাট খাদে। প্রাকৃতিক এই গঠন কেবল ভৌগোলিকভাবে নয়, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত দিক থেকেও বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক আশ্চর্য রহস্য বলা চলে।
১ লাখ ৭৩ হাজার ৮০০ হেক্টর নিয়ে গঠিত সংরক্ষিত এলাকাটি সবার নজরে আসে ২০১৪ সালে। গভীরতম এ উপত্যকাটি প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং গড় গভীরতা প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিটার। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের উৎপত্তি নিয়ে কিছু মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে মনে করা হয় অঞ্চলটি ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগে সৃষ্টি হয়েছিল।
তবে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের প্রকৃত রহস্য লুকিয়ে আছে এর অভ্যন্তরে। গবেষণা বলছে, এখানে রয়েছে এক বিস্ময়কর জীববৈচিত্র্য। বিশেষত বিপন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য এটি এক আশ্রয়স্থল। ইরাবতী ডলফিন, বটলনোজ ডলফিন ছাড়াও এখানে মিনকি তিমি (minke whales) এবং ব্রাইড তিমি (Bryde’s whales) ঘন ঘন দেখা গেছে বলে জানা যায়।
অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এ অঞ্চলের খাদ এবং সমুদ্রপ্রবাহের ভিন্ন প্রকৃতি ডলফিন ও তিমির চলাফেরার জন্য উপযোগী এক নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই খাদ তৈরি হলো? ভূতত্ত্ববিদদের মতে, হাজার বছর আগে গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বিশাল পলিবাহিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ার সময় প্রবল জলোচ্ছ্বাস, স্রোত ও পলি প্রবাহে সমুদ্রতলে একরকম খোঁড়াখুঁড়ির মতো ঘটনা ঘটে। এই প্রাকৃতিক ক্ষয় প্রক্রিয়ার ফলেই জন্ম নেয় সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডকে নিয়ে একাধিক রহস্যময় তত্ত্ব চালু রয়েছে। অনেক মৎস্যজীবী বলেন, এই এলাকায় হঠাৎ করেই মাছের পাল উধাও হয়ে যায় কিংবা স্বর্ণের মতো ঝলমলে কিছু আলো মাঝরাতে দেখা যায় পানির নিচে। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে এদের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই, তবে ধারণা করা হয় এটি গভীর সমুদ্রপ্রবাহে আলোক প্রতিফলনের ফল হতে পারে। তবে এই ধরনের ঘটনা স্থানীয়দের মনে একরকম অতিপ্রাকৃত ভয় ও কৌতূহল তৈরি করেছে বহু বছর ধরে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডকে দেশের প্রথম সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (Marine Protected Area - MPA) হিসেবে ঘোষণা করে।
সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড দেশের সম্ভাবনাময় ব্লু ইকোনমির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এখানকার পানির গুণগতমান শ্রীলঙ্কা, ভারত, মায়ানমার ও মালদ্বীপের চেয়েও উন্নত। বিশেষ করে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল। সবমিলিয়ে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড এটি বাংলাদেশের এক প্রাকৃতিক বিস্ময়।
তারেক
.jpg)
.jpg)