এ পৃথিবী অনেকটাই রহস্যময়। আর এ রহস্যময় পৃথিবীতে রয়েছে এমন কিছু অবাক করা তথ্য- যা শুনলে মনে হয় আজগুবি, কিন্তু আসলে সত্য। এই যেমন ১০ চোখওয়ালা কাঁকড়া। যার প্রতি লিটার রক্তের দাম ১৮ লাখ টাকা! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। এর রক্ত লালের বিপরীতে নীল হয়। সাধারণ মানুষের কাছে এটি পরিচিত না হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক।
বিশেষ এই কাঁকড়ার নাম হর্সশু ক্র্যাব। এর মোট চারটি প্রজাতি রয়েছে। একটি আমেরিকা (লিমুলাস পলিফেমাস) ও বাকিগুলো উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়। এটির আকার-আকৃতি অনেকটা ট্যাংকের মতো। এটি জীবন্ত জীবাশ্ম অর্থাৎ কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই প্রায় ৪৪৫ মিলিয়ন বছরের বেশি পৃথিবীতে টিকে আছে সেই ডায়নোসরের আগে থেকে। এই টিকে থাকার প্রধান কারণ হলো এদের দেহের গঠন। কথিত আছে ‘এটি যতক্ষণ না ভাঙে ততক্ষণ জোড়া নেয় না।’ এদের মাথায় দুটি বড় চোখ ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন অংশে ছোট ছোট চোখ রয়েছে। যা বিভিন্ন দিক থেকে আলোর উপস্থিতি শনাক্ত করতে সাহায্য করে। হর্সশু ক্র্যাবের স্ত্রী প্রজাতি পুরুষ প্রজাতির তুলনায় বড় আকারের হয়। প্রজনন মৌসুমে এরা তীরে এসে প্রায় এক লাখ ডিম পাড়ে।
করোনা মহামারিতে বিশ্বজুড়ে যেখানে সবার নজর ছিল কীভাবে দ্রুত একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করা যায়। সেখানে সমুদ্রের এই ছোট্ট প্রাণী মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ভাবছেন তা আবার কীভাবে? আর এই কাঁকড়ার রক্তে এমন কী আছে, যা এত মূল্যবান?
মানুষের রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের জন্য লোহাভিত্তিক প্রোটিন হিমোগ্লোবিন ব্যবহৃত হয়, যা রক্তকে লাল রং দেয়। অন্যদিকে, হর্সশু ক্র্যাবের রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে তামাভিত্তিক প্রোটিন হেমোসায়ানিন ব্যবহৃত হয়, যা রক্তকে নীল রং প্রদান করে। যার এক লিটারের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে গুনতে হবে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার।
হর্সশু ক্র্যাবের রক্তে আছে লিমুলাস অ্যামেবোসাইট লাইসেট (এলএএল) নামক এক বিশেষ উপাদান, যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া (এন্ডোটক্সিন) শনাক্ত করতে পারে। ১৯৭০ সালের দিকে পাইরোজেন টেস্টের পরিবর্তে এই কাঁকড়ার রক্ত ব্যবহৃত হয়। করোনার ভ্যাকসিন তৈরি হলেও, সেটি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করার আগে নিশ্চিত হতে হয় যে এতে কোনো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নেই। আর তখন ভ্যাকসিনের প্রতিটি ডোজে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়েছে এর রক্ত। এ ছাড়া অন্যান্য অনেক ওষুধের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষায় এই রক্তের ব্যবহার হচ্ছে। যার ফলে এই কাঁকড়ার রক্ত অত্যন্ত দামি।
এদের জীবন্ত জীবাশ্মও বলা হয়। কারণ ৪৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগেও পৃথিবীতে এদের অস্তিত্ব ছিল। ডায়নোসরের চেয়েও প্রায় ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিল এই লিমুলাস। তাই এই জলজ প্রাণী বিজ্ঞানীদের কাছে আজও বিস্ময়।
এরা প্রধানত অগভীর সমুদ্র ও নরম বালি বা কাদাসমৃদ্ধ সমুদ্রতলে বাস করে। কালেভদ্রে যৌন সঙ্গমের জন্য এদের ডাঙায় আসতে দেখা যায়। চাষের কাজে সার হিসেবে এবং মাছ ধরার সময় টোপ হিসেবেও এদের ব্যবহার করা হয়।
মূলত আমেরিকা ও এশিয়ার কিছু উপকূলবর্তী অঞ্চলে পাওয়া এই কাঁকড়ার রক্তের চাহিদা ব্যাপক। তবে বাণিজ্যিকভাবে রক্ত সংগ্রহ, জাপানে সমুদ্রতটবর্তী বাসভূমি ধ্বংস, উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে অত্যধিক চাষের কারণে এদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রাণীটি আমাদের পরিবেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদের রক্ত থেকে অনেক ধরনের ওষুধ তৈরি হয়। তাই এদের সংখ্যা কমে যাওয়া আমাদের সবার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)