মতলব মেম্বারের মাথাখানা ফাটিয়ে তার ঘিলুগুলো একটা দোমড়ানো গোল টিনের টিফিন বাক্সে ভরে নিচ্ছে খুনি। সে জানে না মতলব মেম্বার কচ্ছপের মতো ৩০০ বছর বাঁচবে বলে তার বন্ধু মনা ঠাকুরকে ১ হাজার ৭৩২ টাকা দিয়ে নেপালে তন্ত্র সাধনা করতে পাঠিয়েছিল। সে অনেক কাল আগের কথা। তখন মতলব মেম্বার ও মনা ছিল হরিহর আত্মা। খুনি সেসব কথা জানে না। তখনো সে জন্মায়নি।
খুনি মতলব মেম্বারের নিথর দেহটাকে একটা চেয়ারের ওপর বসিয়ে তার মাথার ফাঁকা খুলির ভেতর চারটি হলুদ রঙের গোলাপ সাজিয়ে দিল। মতলব মেম্বার তার চার নম্বর শিকার। খুব তৃষ্ণা পাচ্ছে তার। ফ্রিজ খুলে একটু ঠাণ্ডা জল খেয়ে নিল সে। ফ্রিজের ভেতর থরে থরে মিষ্টির প্যাকেট সাজানো। মতলব মেম্বারের বউ বাচ্চা হওয়ার সময় মারা যায়। মতলব মেম্বারের বাবা-মা মারা গেছে অনেক দিন হলো। কৃপণ স্বভাবের জন্য মতলব মেম্বারের ভাইবোনরা কেউই তার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখে না। তারা বলে বেড়ায়, মতলব মেম্বার নাকি তার বাবা-মাকে বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলেছে। মতলব মেম্বারের ভাইবোনরা কেউ ছিল রাজমিস্ত্রি, কেউ আলুর ব্যাপারী, কারও ছিল ভাঙারির ব্যাবসা। কিন্তু মতলব মেম্বারের সব ছিল। মাছের আড়ত, গাদা গাদা টাকা, গ্রামের ছোকরা ছেলেপেলের দল ও পোষা দুই চারটা ভূত। সবকিছু! কিন্তু ভরা পূর্ণিমার ভয়ে সে সব ভূত কৌটা থেকে বেরিয়ে এসে তাকে আর বাঁচাল না।
প্রথম তিনটি খুনের পর গ্রামের লোক তো এও সন্দেহ করত, খুনি আর কেউ নয়, খুনি হলো মতলব মেম্বার স্বয়ং। মতলব মেম্বারই তার পোষা ভূত দিয়ে গ্রামে এই তিনটি খুন করিয়েছে। কাল সকাল থেকে অবশ্য নতুন খুনির গল্প বানাবে তারা। সারা গ্রামে একমাত্র মতলব মেম্বারেরই সাদা মার্বেল বসানো তিনতলা বাড়ি। বাড়ির ছাদের চিলেকোঠার ঘরে একটি হলুদ প্লাস্টিকের কৌটায় মতলব মেম্বারের পোষা ভূতগুলো রাখা থাকে। সেই ভূতগুলো এই বাড়ি পাহারা দেয়। এই কৌটা ভর্তি ভূত নাকি মতলব মেম্বারের বন্ধু মনা তান্ত্রিক তার প্রিয় বন্ধুর বাড়ি ও টাকা পাহারা দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিল।
ভূতদের আগে মতলব মেম্বারের সাদা তিনতলা বাড়ি পাহারা দিত উত্তরবঙ্গের এক বুড়ো দারোয়ান। এরকমই এক ভরা পূর্ণিমার রাতে মতলব মেম্বারের মেয়ে তার মায়ের ১৬ ভরি স্বর্ণ, নগদ ৭ লাখ টাকা, জামা-কাপড় ও তার বাবা-মায়ের একটা বাঁধাই করা ছবিসহ সেই বুড়ো দারোয়ানের সঙ্গে নায়িকা হতে ঢাকা পালিয়েছিল। এই ঘটনার দুদিন পর ঢাকা থেকে মতলব মেম্বারের মেয়ে তাদের বিয়ের খবর দেয়। ওই শেষ! মতলব মেম্বার তার মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করতে আর দেরি করেনি।
দূর থেকে মালগাড়ি যাওয়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। খুনির এবার ফিরে যেতে হবে নিজ ঘরে, মিশে যেতে হবে গ্রামবাসীদের মধ্যে। খুনি ফ্রিজ থেকে দুটি শুকনো মিষ্টির প্যাকেট ব্যাগে ভরে নিল। মার্বেলের সাদা পাথরে ঢাকা বাড়ি থেকে যখন খুনি বেরিয়ে এল চারটি কুকুর দূর থেকে তাকে দেখতে পেয়ে খুব চেঁচাতে শুরু করেছে। কিন্তু খুনির কাছাকাছি আসতেই তারা চুপ করে গেল। তারা খুনিকে চেনে। তারা গলির মুখ অবধি খুনিকে এগিয়ে দিয়ে আসল। খুনি যখন বারই পাড়ার পুকুর পেরোচ্ছে। তখন দেখল ফুলঝুরি গ্রামের হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক করিমুদ্দিনের একমাত্র মেয়ে হোসনেয়ারা বানু বরফের মতো হিমশীতল পুকুরের জলে গলা পর্যন্ত শরীর ডুবিয়ে ঘুমিয়ে আছে। হোসনেয়ারা বানুর মাথা ঠিক নেই। বছরের অর্ধেক সময় সে ঢাকার মানসিক হাসপাতালে কাটায়। বাড়িতে থাকলে ২৫ বছরের বিয়ের উপযুক্ত এই মেয়েকে বাড়িতে আটকে রাখতে হয়। হুরের মতো দেখতে হোসনেয়ারা বানু শরীরে জামা কাপড় রাখতে চায় না। ১৪ বছর বয়স থেকে হোসনেয়ারা বানুর এই রোগে ধরেছে। তাকে যতই ধরে-বেঁধে রাখুক সে একটা সময় সবাইকে ফাঁকি দিয়ে দরজা খুলে বের হয়ে গিয়ে পুকুরের জলে গলা অবধি ডুবে বসে থাকবে। অপেক্ষা করবে কখন তার মরা ভাই জল থেকে ভেসে উঠবে।
হোসনেয়ারা বানুর যখন ১৪ বছর বয়স তখন তার ৯ বছর বয়সী ভাই ওই পুকুরে ডুবে মারা যায়। শনিবারের ভর দুপুরে ডুবে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেও হোসনেয়ারা বানু খোলা চুলে তার ছোট ভাইকে সাঁতার শেখাচ্ছিল। লোকে বলে হেড মাস্টার করিমুদ্দিনের বউ নাকি তার প্রতিদিন খাওয়ার সময় মাছের বড় টুকরোটা ছেলেকে খাওয়াত। সেই রাগে হোসনেয়ারা বানু তাকে ডুবিয়ে মেরেছে। খুনি অবশ্য এসব কথা বিশ্বাস করে না। ডিসেম্বের এই শীতে নিশ্বাস নিতে গেলেও মনে হচ্ছে হাওয়ার সঙ্গে বরফের কুচি নাকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। খুনির খুব মায়া হলো মেয়েটার জন্য। নিওমোনিয়া হয়ে দুদিনের মাথায় মেয়েটা নির্ঘাত মরবে। কষ্টে চোখে জল এল খুনির। কিন্তু সবকিছু তো আর তার হাতে নেই। সে চাইলেও হোসনেয়ারা বানুকে তার সঙ্গে কেউ বিয়ে দেবে না। সৃষ্টিকর্তা যে কেন এত নিষ্ঠুর!
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোরের আলো ফুটে উঠবে। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা খুনির জন্য ঠিক নয়। খুনি তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। বাড়ি গিয়ে রান্না চাপাতে হবে। বেশ করে ঝাল দিয়ে কষিয়ে মতলব মেম্বারের ঘিলু রাঁধতে হবে খুনিকে। তারপর রাতের প্রথম প্রহরে ভেজানো পান্তা ভাতের সঙ্গে গরম ঝাল ঝাল মানুষের ঘিলুখানা অমৃতের মতো লাগবে। খুনি মুখের ভেতরখানা লালায় ভরে গেল।
সকালে মতলব মেম্বারের ঘরে কাজ করতে আসা কাজের মেয়ে নাসরিনের মা শিল্পী মতলব মেম্বারের বাড়ির সামনে এসে দেখল বাড়ির দরজা খোলা। একতলার সিঁড়ি থেকে দোতলার দরজার মুখ পর্যন্ত একটা সরু শুকিয়ে যাওয়া ঝর্ণার ধারার মতো রক্ত নেমে এসেছে। এবং সে আরও দেখল দোতলার মুখের কাছে একটা ইজি চেয়ারে মাথার খুলির ভেতর চারটা হলুদ গোলাপ নিয়ে মরা মতলব মেম্বার তার দিকে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে।
মতলব মেম্বারের ভূত মতলব মেম্বারের মরা দেহের পাশে দাঁড়িয়ে অনেক করে ভাববার চেষ্টা করছে কিন্তু শেষ দু-তিন বছরের কোনো কথাই সে মনে করতে পারছে না। পুলিশ এসে সারা বাড়ি সিল করে মতলব মেম্বারের বডি ময়নাতদন্তের জন্য গাড়িতে তুলছে তখনো মতলব মেম্বারের ভূত খুব চেষ্টা করছে তার জীবনের গল্পগুলো একটা একটা করে মনে করবার। সে তার ছোটবেলা থেকে বছর দুই আগে পর্যন্ত যেসব স্মৃতি মনে করতে পারল তাও নয়। বারবার দুটি মুখ আর একটা নাম চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। মুখ দুটির একটি তার মরা মায়ের আর অন্যটি তার মেয়ের। আরেকটি নাম। নামটি তার ল্যাংটো বয়সের বন্ধু মনা তান্ত্রিকের। তাকে সে কত যুগ যে দেখেনি তাও মতলব মেম্বার মনে করতে পারল না। শুধু এতটুকু মনে আছে তার সেই বন্ধু মনা তান্ত্রিক থাকে নেপালে। মতলব মেম্বারের ভূত বাতাসে ভর করে নেপালের দিকে রওনা দিল। যে মতলব মেম্বার মরে যাওয়ার ভয়ে কোন দিন বিমানে চড়েনি সেই মতলব মেম্বারের ভূত মরে গিয়ে আজ আকাশ পথে চলেছে। তার বন্ধু মনা ঠাকুর ওরফে মনা তান্ত্রিককে এক ভুলে যাওয়া ভূতের মরে যাওয়ার তদন্ত করতে বলবে বলে।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটি
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)