দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এক মাস ধরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র ৮ মাসের ব্যবধানে সাতজন মেধাবী ছাত্রছাত্রী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে। প্রথমে অনেকে ভেবেছিল হয়তো প্রেমের টান, পারিবারিক সমস্যা। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ততই বোঝা গেল বিষয়টা সহজ নয়। প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে রাতে— কেউ লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার পর, কেউ হলে ফেরার পথে, আবার কেউ-বা টিউশনি শেষে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। কোথাও কোনো লাশ নেই, কোনো সাক্ষী নেই, নেই সামান্যতম চিহ্ন; কোনো চিৎকার শোনা যায়নি, সামান্য রক্তের দাগও নয়— শুধু অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার রহস্য।
পুলিশ ফাইল খুলেছে বটে, কিন্তু তাদের মুখে বুলি একটাই— ‘তদন্ত চলছে।’ পরিবারের কান্না আর শিক্ষার্থীদের উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও অগ্রগতি নেই বললেই চলে। অদ্ভুত গুজব ঘুরে বেড়াচ্ছে— কেউ বলছে, রাতের আঁধারে কোনো গোপন সংগঠন শিকার খুঁজে বেড়াচ্ছে, আবার কেউ ফিসফিস করে বলে, ‘ক্যাম্পাসে অশরীরী কিছু ঘুরে বেড়ায়।’ এই অনিশ্চয়তার মাঝে সিনিয়র সাংবাদিক আরিফ হাসান নামেন তদন্তে। পেশাগত দায়িত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত ব্যথাই তাকে টেনে আনে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিখোঁজ হওয়া ছাত্র, পদার্থবিজ্ঞানের মেধাবী তরুণ সায়েম ছিল তার ছোট ভাইয়ের প্রিয় বন্ধু। পরিবার ভেঙে পড়েছে, আরিফের নিজেরও মনে হচ্ছে— যদি সে না খুঁজে, সায়েম আর অন্যদের কোনোদিনই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আরিফ জানত, এই রহস্য উন্মোচন সহজ হবে না। কয়েক দিন ধরে আরিফ নোট নিচ্ছিল। বন্ধু, শিক্ষক, পরিবার— যার কাছ থেকে সম্ভব, সবার সঙ্গে কথা বলল। কাগজপত্র ঘেঁটে, পুরোনো নোটবই উল্টেপাল্টে, ফেসবুক প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখে তিনি ধীরে ধীরে অদ্ভুত মিল পেলেন। সাতজন নিখোঁজ— তাদের সবারই অসাধারণ মেধার পরিচয় ছিল। কারও গবেষণাপত্র বিশ্ববিদ্যালয় জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, কেউ জ্যোতির্বিদ্যার জটিল সমীকরণে দক্ষ; আবার কেউ দর্শনের জটিল মতবাদ নিয়ে সেমিনারে সবাইকে চমকে দিয়েছিল। এরা সবাই ছিল তাদের নিজ নিজ ব্যাচের সেরা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। আরেকটি ভয়ংকর মিল ধরা পড়ল জন্মতারিখে। আরিফ লক্ষ্য করল, প্রত্যেকের জন্মদিন ভিন্ন হলেও সেগুলো আকাশের এক বিশেষ নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে মিলে যায়— সপ্তর্ষি। প্রথমে আরিফ এই মিলকে কাকতালীয় ভেবেছিল। কিন্তু তথ্য যত গভীর হলো, তার মনে সন্দেহ ততই প্রবল হতে লাগল। রাতের নিস্তব্ধতায় ডেস্কল্যাম্পের আলোয় নোটবুক ভরিয়ে লিখল আরিফ— ‘এগুলো নিছক নিখোঁজ নয়। হয়তো কারও দরকার এই নির্দিষ্ট জন্মতারিখের ছাত্রছাত্রীদের… কেন?’ প্রশ্নটা তাকে প্রতিমুহূর্তে তাড়া করতে লাগল। প্রশ্নগুলো তার ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। বাইরের হাওয়ায় তখন হালকা শিরশিরে শীত, কিন্তু আরিফের শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল অন্য রকম এক ঠাণ্ডা— যেটা আসে ভয় থেকে, আর অজানার মুখোমুখি দাঁড়ানোর অদৃশ্য পূর্বাভাস থেকে।
পরের দিন সকালেই আরিফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। নিখোঁজ ছাত্রছাত্রীদের তথ্য নিয়ে, সে ভাবছিল কোথা থেকে সূত্র মিলবে। হঠাৎ মনে হলো, সবচেয়ে কাছের সূত্র হতে পারে সেই অধ্যাপক যিনি প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনে অনন্যজ্ঞ। তিনি ছিলেন ড. মঞ্জুর আলম— একজন স্বনামধন্য শিক্ষক। ড. মঞ্জুর আলমের অফিসে ঢুকতেই আরিফ লক্ষ্য করল— দেয়ালে নক্ষত্রপুঞ্জের ছবি, পুরোনো মানচিত্র আর কিছু প্রতীক। অফিসের বাতাসে যেন হালকা ধোঁয়ার গন্ধ, আর ডেস্কে ছড়িয়ে আছে অগণিত বই ও নোটবই। ‘শুভ সকাল, আরিফ,’ অধ্যাপক ধীরস্বরে বললেন। ‘আমি জানি তুমি কেন এসেছ। নিখোঁজ হওয়া ছাত্রছাত্রীদের ঘটনা পড়েছি। সত্যি বলতে, কিছুটা আশ্চর্য হলাম যে, কেউ এই রহস্যে কাজ করছে।’ আরিফ সরাসরি বলল, ‘স্যার, আমি খুঁজে বের করতে চাই কারা এই নিখোঁজের পেছনে। আমি চাই সত্যটা জানতে।’ ড. মঞ্জুর একটু থেমে বললেন, ‘সপ্তর্ষি নক্ষত্র নিয়ে বহু কাল্টের বিশ্বাস আছে। প্রাচীনদের মতে, সাতজন নির্বাচিত আত্মা উৎসর্গ করলে মানুষ অতিপ্রাকৃত বা দেবতুল্য জ্ঞান লাভ করতে পারে। অনেকেই এটাকে শুধু রূপক বলে মনে করে। কিন্তু কেউ যদি সত্যিই এটাকে অনুসরণ করে?’ আরিফের রক্ত জমে গেল। সে বুঝতে পারল— কেউ এই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিতে চাইছে। নিখোঁজ ছাত্রছাত্রীদের মেধা আর জন্মতারিখের মিল, সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। ‘আপনি কি... সত্যিই বলেন, কেউ এটি করছে?’ আরিফের কণ্ঠে হালকা শিহরণ। ড. মঞ্জুর শান্তস্বরে বললেন, ‘এটি তো শুধু অনুমান। তবে কখনও কখনও অনুমানই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছে দেয়।’ আরিফ বেরিয়ে আসার পরও ভাবছিল— অধ্যাপক যে কথা বললেন, তা শুধুই একটি ধারণা না, নাকি এই অদ্ভুত নিখোঁজের ঘটনা একেবারে বাস্তবের অংশ? অন্ধকার রহস্যের দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল। আরিফ বুঝতে পারল, এটি নিখোঁজ হওয়া নয়— কেউ সেই পুরোনো বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
কাগজপত্র, নোটবই এবং বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে ইতোমধ্যে তিন দিন কেটে গেছে আরিফের। প্রতিটি সূত্রই যেন একটা অজানা তীরে ঠেকিয়ে দিয়েছে— নিখোঁজ ছাত্রছাত্রীদের শেষ অবস্থান, বন্ধুবান্ধবদের সাক্ষাৎ, লাইব্রেরির পুরোনো ভিডিও ফুটেজ। কিন্তু কোথাও স্পষ্ট সূত্র মিলছিল না। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল—নিখোঁজ হওয়া সায়েমের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রুকাইয়া। সে সর্বদা সায়েমের সঙ্গে মিশত। আরিফ ফোন করল, কিন্তু রুকাইয়া ফোন ধরল না। তখন তার মনেই একটা ধারণা হলো—রুকাইয়া হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ক্লাস বা লাইব্রেরির আশপাশে থাকতে পারে। আরিফ ছুটে গেল ক্লাসে। সেখানে বসে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করল। এক বন্ধু হালকা ভয় পেতে পেতে বলল, ‘হয়তো… রুকাইয়া লাইব্রেরিতে অপেক্ষা করছে। সে সব সময় নিখোঁজ ছাত্রছাত্রীদের তথ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকে।’ লাইব্রেরির পুরোনো আলোকিত করিডোরে ঢুকতেই আরিফ লক্ষ্য করল— একটি ছায়াময় মুখ, যা পরিচিত। ধীরে ধীরে এগিয়ে এল রুকাইয়া। ‘আরিফ ভাই?’ রুকাইয়া ফিসফিস করে বলল, ‘আমি জানি তুমি সত্য বের করতে চাও। কিন্তু এটা সহজ হবে না। নিখোঁজদের জন্য সময় কম। কেউ আমাদের লক্ষ্য করছে, আমি নিশ্চিত।’ আরিফ শ্বাস ফেলল এবং বুঝতে পারল— এবার তাকে রক্ষা করতে হবে। নিখোঁজ ছাত্রছাত্রীদের রহস্যের সঙ্গে একমাত্র সূত্র হলো রুকাইয়া, আর তার সঙ্গে মিলেই আসল তদন্ত শুরু হবে।
নোটবই এবং রুকাইয়ার স্মৃতি অনুযায়ী, এক প্রাচীন, পরিত্যক্ত মৌলভীবাজার রোডের পুরোনো মানমন্দির ছিল সম্ভাব্য আস্তানা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে রাতের পথে তারা পৌঁছাল। মন্দিরের চারপাশে ঘন অন্ধকার, আর বাতাসে আছড়ে পড়ছে অদ্ভুত নিঃশব্দ কাঁপুনি। ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আরিফ বুঝল— কিছু কিছু ছায়া সরছে এবং দেয়ালে অদ্ভুত প্রতীক। মৃদু বাতি, ধোঁয়ার গন্ধ এবং দূরে কোনো কণ্ঠস্বরের ফিসফিস— সব মিলিয়ে একটা গোপন আচার চলছে। ভেতরে ঢুকেই তারা দেখল নিখোঁজ ছাত্রছাত্রীরা একটি বৃত্তে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, আর চারপাশে মুখোশধারী কয়েকজন। রুকাইয়া ফিসফিস করে বলল, “এটাই সেই গোপন আচার। আরিফ ভাই, আমরা সময়মতো পৌঁছেছি। যদি এখনই না করি, সবার জীবন বিপদে। লক্ষ্য কর— সবই পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে। আরিফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবল— পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ভর করছে নিখোঁজদের বাঁচানোর ওপর। বাতাসে ভেসে আসছে অদ্ভুত গন্ধ। তাদের সামনে গোপন আচার, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি, আর নিখোঁজদের জীবন— সব মিলিয়ে রাতের এই অন্ধকার যেন মৃত্যুর ছায়া।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটি
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)