জাপানের অন্যতম বড় উৎসব ওবন। প্রাচীন জাপানি বিশ্বাস এবং পূর্বপুরুষদের আত্মাকে বৌদ্ধ রীতিতে সম্মান জানানো হয় এ উৎসবে । জাপানে এ রীতি পারিবারিক পুনর্মিলনী উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হয়, পূর্বপুরুষদের আত্মারা এ সময় গৃহস্থালির বেদিগুলোতে ফিরে আসেন।
লিপিবদ্ধ ইতিহাস অনুযায়ী সম্রাজ্ঞী সুইকোর (৫৯২-৬২৮ সাল) রাজত্বকালে প্রথম বৌদ্ধ ঐতিহ্য হিসেবে ওবন উৎসব পালন শুরু হয়। ৭৩৩ সালের মধ্যে জাপানের রাজদরবারে এটি একটি প্রথাগত বৌদ্ধ ছুটির দিন হিসেবে প্রবর্তিত হয়েছিল। ওবন উৎসব তিন দিন ধরে চলে। তবে, জাপানের বিভিন্ন এলাকায় এর শুরুর তারিখটি বদলে যায়। মেইজি যুগের শুরুতে যখন চন্দ্র ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন করা হয়েছিল, তখন জাপানের স্থানীয় পর্যায়ে ওবনের তিনটি ভিন্ন সময় নির্ধারিত হয়েছিল। মেইজি যুগ বলতে জাপানের সম্রাট মুতশুহিতোর ৪৫ বছরের শাসনকালকে বোঝানো হয় (১৮৬৮-১৯১২)। এটিকে জাপানের আধুনিকায়নের যুগ বলে বিবেচনা করা হয়। চান্দ্র ও গ্রেগরিয়ান মাসের সমন্বয়ে হেরফেরের কারণে জাপানের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে এটি পালিত হয়। প্রবাসী জাপানিরাও এ উৎসব পালন করেন। উৎসবের এ দিনগুলোকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় না যদিও, তবে এ সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি দেওয়ার রীতি প্রচলিত।
উৎসবটির উৎপত্তি বুদ্ধের একজন শিষ্য মহা মৌদগল্যায়নের (মোকুরেন) কিংবদন্তি থেকে, যিনি অলৌকিক শক্তি ব্যবহার করে তার মৃত মাকে দেখেছিলেন এবং জানতে পেরেছিলেন, তার মা ক্ষুধার্ত ভূতের রাজ্যে পতিত হয়েছেন এবং ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। ভীষণ দিশেহারা হয়ে তিনি বুদ্ধের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন- কীভাবে তার মাকে ওই ভূতের রাজ্য থেকে মুক্তি দিতে পারেন। বুদ্ধ তাকে সপ্তম মাসের ১৫ তারিখে গ্রীষ্মকালীন বিশ্রাম শেষ করা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উদ্দেশে নৈবেদ্য উৎসর্গ করতে বলেছিলেন। মোকুরেন তা-ই করেছিলেন এবং এতে তার মায়ের মুক্তি দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি তার মায়ের অতীত নিঃস্বার্থতার প্রকৃত প্রকৃতি এবং তার জীবদ্দশায় তিনি তার পুত্রের জন্য যেসব ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তাও দেখতে পাচ্ছিলেন। মোকুরেন তার মায়ের দুঃখ থেকে মুক্তি পেয়ে খুশি হয়ে ওঠা এবং তার অফুরন্ত দয়ার জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে আনন্দে নাচতে শুরু করেছিলেন। তার এই আনন্দের নাচ থেকে বন ওডোরি বা বন নৃত্যের উৎপত্তি। বন ওডোরি হলো ওবনের সময় পরিবেশিত নৃত্যের একটি ধরন। মূলত মৃতদের আত্মাদের স্বাগত জানানোর জন্য এটি পরিবেশিত হয়।
এ উৎসব উদযাপনের ধরন অঞ্চলভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে। প্রতিটি অঞ্চলে একটি স্থানীয় নৃত্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগীতও পরিবেশিত হয়। এই সংগীত ওবনের আধ্যাত্মিক বার্তার সঙ্গে সম্পর্কিত গান হতে পারে অথবা স্থানীয় লোকগানও হতে পারে। জাপানি পরিবারগুলোতে এ উপলক্ষে কামিদানা নামে পরিচিত বেদি সাজানো হয় এবং ফুল, খড়ের মূর্তি, পশু এবং বিভিন্ন খাবার দিয়ে নৈবেদ্য সাজানো হয়। মৃত ব্যক্তির নাম লেখা ফলকের সামনে নৈবেদ্য স্থাপন করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা ওবনের সময় নদীতে মোমবাতি জ্বালানো লণ্ঠন রাখেন। উৎসবের প্রথম সন্ধ্যায় তারা আত্মাদের বাড়ি ফেরার পথ দেখানোর জন্য একটি ছোট আগুন জ্বালেন। অতীতে লোকেরা কবরস্থানের দিকে আলোর সারি জ্বালাতো, যাতে আত্মারা তাদের পথ খুঁজে পায়। উৎসবের তৃতীয় দিনে আত্মাদের বিদায় জানাতে আগুন দিয়ে অন্য দিকে পাঠানো হয়। একে ওকুরিবি বলা হয়। অথবা বৃহত্তর পরিসরে, পাহাড়ে বড় ধরনের আগুন জ্বালানো হয়। এই প্রথায় ছোট ছোট লণ্ঠন ব্যবহার করে তা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এটি হচ্ছে আত্মাদের মৃতদের জগতে ফিরে যাওয়ার পথের প্রতীক।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)