সময়টা ১৯২২ সালের ৪ নভেম্বর। মিসরের ভ্যালি অব দ্য কিংস অঞ্চলে সেই পদক্ষেপ মিসরবিদ্যা তথা মানব ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার আবিষ্কার করলেন এক বিস্ময় অর্থাৎ ফারাও তুতেনখামেনের প্রায় অক্ষত সমাধি। তিনি বছরের পর বছর ধরে পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন এই সমাধির রহস্য জানার জন্য। অবশেষে যে দৃশ্যটি গোটা বিশ্বের নিশ্বাস আটকে দিয়েছিল, তা ছিল সমাধির ভেতরে পৌঁছানোর জন্য প্রবেশের এক বিশেষ দরজা।
৩ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মানব স্পর্শ থেকে দূরে থাকা এক নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে ছিল এই দরজা। এই ভেতরের দরজাই ছিল ফারাওয়ের বিশ্রামকক্ষকে বাহিরের পৃথিবী থেকে নিরাপত্তায় আচ্ছাদনে লুকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা।
দরজাটি কোনো আধুনিক তালা দিয়ে আটকানো সম্ভব ছিল না সেই যুগে। তালা বলতে আমরা যা বুঝি সেই ধরনের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না তাতে। কারণ দরজার হাতলগুলো মজবুত দড়ি বা রশি দিয়ে শক্তভাবে গিঁট দেওয়া ছিল। আর সেই দড়ির গিঁটের ওপর একটি মাটির সিলমোহর লাগানো ছিল।
এই সিলমোহরটি কোনো সাধারণ সিল ছিল না, এটি ছিল এক পবিত্র শপথ। এর গায়ে প্রাচীন মিসরের নেক্রোপলিস বা (কবরস্থানের রক্ষক দেবতা আনুবিসের প্রতীক খোদাই করা ছিল)। এই চিহ্নটিই পরবর্তী সময়ে অক্ষত পাওয়ার অর্থ এই যে সমাধিটি রাষ্ট্রের হেফাজতে ছিল এবং ৩ হাজার বছর পরেও ধারণা করা যায় ভেতরের ফারাওয়ের মমি ও ধন-সম্পদ সবকিছু অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।
আরো পড়ুন: লবণ মানুষ
কার্টার ১৯২২ সালের নভেম্বরের শেষদিকে এই দৃশ্যটি দেখেই তিনি বুঝেছিলেন যে প্রাচীনকালে দুবার সামান্য লুটপাট হলেও, ভেতরের মূল কাঠামোটিতে কোনো হাত পড়েনি। কারণ, এই সিলমোহরটি ছিল এতটাই অটুট। ৩ হাজার বছর একটি সুদীর্ঘ সময়, এই সময়ে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গেছে, কত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে এবং কত নতুন সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটেছে অথচ এই রশির গিঁট, মাটির সিলমোহর এবং কাঠের দরজাটি ছিল নিশ্চল। এই দরজা মিসরীয়দের উন্নত সংরক্ষণ কৌশল, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস এবং পরকালের প্রতি তাদের গভীর আস্থার প্রমাণ। ভাবা যায়?
যে রশিটি আজকের দিনে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটি তৈরি হয়েছিল তুতেনখামেন-এর মৃত্যুর সময়ে আর সেই সময়ে বোনা তন্তুগুলোই তিন সহস্রাব্দ ধরে নিজেদের দৃঢ়তা ধরে রেখেছিল, যা আধুনিক বিজ্ঞানীদেরও অবাক করে। এই প্রাচীন ঐতিহাসিক দরজা খোলার অনুমতি পেতেও বেশ কিছু সময় চলে যায়। হাওয়ার্ড কার্টার যখন ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষবারের মতো এই সিলমোহরটি ভাঙার অনুমতি পান, তখন তিনি শুধু একটি দরজা খোলেননি, তিনি যেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের রহস্য উন্মোচন করেছিলেন। এ দরজাটি পরবর্তী সময়ে বিশ্বকে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি অমূল্য সামগ্রীর সন্ধান দিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল স্বর্ণের মুখোশ, রথ এবং ফারাওয়ের মমি।
একটা প্রাচীন দরজা যার আড়ালে হাজার বছরের ইতিহাস লুকিয়ে ছিল এবং সেই দরজা যার গায়ে রয়েছে রহস্যময় সিল, যা আগন্তুককে সতর্ক করে থামিয়ে দেয়। এই ইতিহাস সত্যিই রোমাঞ্চিত করে শিহরিত করে হাজার বছরের রহস্য নিয়ে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)