দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যোদ্ধাদের গুপ্তচরবৃত্তি ছিল চূড়ান্ত ঝুঁকির। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সৃজনশীলতা প্রকাশের অনবদ্য মাধ্যমও। যেখানে সামান্যতম কৌশলও জীবন বাঁচাতে পারত এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যের সফলতা নিশ্চিত করত। এ প্রেক্ষাপটে, মিত্রশক্তির গোয়েন্দা সংস্থা, বিশেষত ব্রিটেনের ‘স্পেশাল অপারেশনস এক্সিকিউটিভ (SOE)’, তাদের প্রতিনিধিদের জন্য এক ধরনের উদ্ভাবনী সরঞ্জাম তৈরি করেছিল, যা ‘স্পাই শুজ (Spy Shoes)’ নামে পরিচিত। এই জুতা জোড়া সাধারণ পরিধেয় না হয়ে, শত্রু দলকে বিভ্রান্ত করতে ‘মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র’ হিসেবে কাজ করত।
জুতার কৌশল ছিল শত্রুর ট্র্যাকারদের ভুল পথে চালিত করে মূল্যবান সময় হাসিল করা, যাতে এজেন্টরা নিরাপদে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। কৌশলের দুটি প্রধান দিক ছিল- ছদ্মবেশী ওভারশুজ (Decoy Overshoes) এবং বিতর্কিত বিপরীত সোলযুক্ত জুতার (Backward-Soles Shoes) ধারণা।
ছদ্মবেশী ওভারশুজ বা রাবারের আবরণগুলো ছিল তুলনামূলক কার্যকর এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত কৌশল। গুপ্তচররা তাদের সামরিক বুট বা জুতার ওপর এই ওভারশুজগুলো পরতেন। এর প্রধান কারণ ছিল সামরিক বুটের ছাপ গোপন করা, যা শত্রুদের কাছে সামরিক উপস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিত। এই ওভারশুজগুলো প্রায়শই এমনভাবে তৈরি করা হতো যাতে ছাপ দেখে মনে হয় এটি স্থানীয় বাসিন্দা বা আদিবাসীদের পায়ের ছাপ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অপারেশনের সময়, এই ওভারশুজগুলো খালি পায়ের ছাপের মতো নকশা করা হতো। এর উদ্দেশ্য ছিল জাপানি সেনাদের বোঝানো যে, ওই এলাকায় সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য নেই শুধু সাধারণ স্থানীয় লোকেরাই যাতায়াত করে।
ইম্পেরিয়াল ওয়ার মিউজিয়ামে এ ধরনের SOE-এর তৈরি ‘স্নিকার্স’ অর্থাৎ ওভারশুজ সংরক্ষিত আছে, যা এই কৌশলের ঐতিহাসিক সত্যতাকে সমর্থন করে। তবে, এই কৌশলটিও ত্রুটিমুক্ত ছিল না; অভিজ্ঞ ট্র্যাকাররা পায়ের ছাপের গভীরতা দেখে অনুমান করতে পারতেন, ভারী ও কিট-বোঝাই করা সামরিক ব্যক্তির পদচিহ্ন, যা স্থানীয় হালকা গড়নের মানুষের পদচিহ্ন থেকে আলাদা।
আবার ব্যাকওয়ার্ড সোলযুক্ত জুতার ধারণাটি ছিল আরও নাটকীয়; জুতার সোল উল্টো দিকে লাগানো হতো, যাতে হেঁটে গেলে ছাপ দেখে মনে হয় ব্যক্তিটি উল্টো দিকে হেঁটেছেন। এ ধারণাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও চোরাকারবারি এবং পলাতকরা ব্যবহার করত বলে অনুমান করা হয়। জুতার এই নকশার উদ্দেশ্য ছিল ট্র্যাকারদের সম্পূর্ণ ভুল দিকে অনুসন্ধান শুরু করতে বাধ্য করা।
সবমিলিয়ে গুপ্তচরদের বিশেষ জুতার কৌশলটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক উদ্ভাবন, ধূর্ততা এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য নিদর্শন। যদিও এর কিছু দিকের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে তবে এটি প্রমাণ করে যে সামান্যতম প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলও কীভাবে চরম চাপের মুখে তাদের জীবন রক্ষার কবচ হয়ে উঠেছিল।
তারেক/
.jpg)
.jpg)