আমাদের পাশেই একজন ঘটকের বসবাস। তিনি একখানা খিলি পান মুখে দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে তার চেম্বারে বসেন। তিনি যেখানেই বসেন তা হয় মজমার মতো বিলাসী টাইপের। তার গানের হারমোনিয়াম রয়েছে। হেঁড়ে গলায় হোক আর সুরেলা রাত ৮টার পর তার চেম্বারে গানের জলসা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন ধরনের লোকের আগমন ঘটে তার কাছে।
তিনি গানের সুরে সুরে তার একটি নিজস্ব জগৎ গড়ে তুলেছেন। তাকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়ে খুঁজতে হয় না। তার চেম্বারে যারা যারা আসেন তারাই তাকে গানের ফাঁকে ফাঁকে ফিসফিস করে বলতে থাকেন ঘটক সাব, অমুক গ্রামে একখান মেয়ে আছে। মেয়ের বাপের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি তখন গানের মুডে থাকলেও কান খাড়া করে ঠিকই তথ্যটি তার মনে ধরে রাখেন। মজমা শেষে তা নোটবুকে লিখে রাখেন। আবার কেউ গান শুনতে শুনতে কারও ছেলের সংবাদ দেন। তার মজমার কোনো সদস্যকে কেউ ছেলের জন্য মেয়ে দেখার কথা বললেই তারা মুজিবর ঘটকের কাছে নিয়ে আসেন। এক কথায় বলা যায়, তার বিবাহের যত ধরনের তেলেসমাতি রয়েছে তা গানের আসরের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এটা না হয় বাড়ির আশপাশের ঘটনার কথা বললাম। অনেক দূরের ছেলেমেয়ের খোঁজখবরের জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। অন্যান্য উপজেলায় প্রথমে সেখানকার একজন ঘটককে তিনি খুঁজে বের করেন। তারপর তিনি তাকে তার গানের মজমায় দাওয়াত করেন। অন্য এলাকার ঘটকও এমন দাওয়াত পেয়ে আসতে মিস করেন না। এসেই তার মায়াজালের ফাঁদে আটকে যান। তার গানের আসর শেষ হওয়ার পর সেখানে থাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। দূরের ঘটকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির পর তাকে দিয়ে তার আরও দূরের ঘটককে খবর দেওয়া হয়। এভাবে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ঘটকের বিরাট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন ঘটক ভাই।
তবে তার মুখের জাদুতে চোখের পলকে তিনি একটি কালো মেয়েকে অপ্সরা বানিয়ে ফেলেন। তিনি যখন কোনো মেয়ের বর্ণনা দেন মনে হবে মেয়েটি সিনেমার ঐশ্বরিয়া রায়। মানুষও তার কথায় পড়ে মেয়ে দেখতে চায়। মেয়ের বাবাকে তার একটাই কথা, মেয়েকে খুবই সাজিয়ে-গুছিয়ে তবেই দেখাতে নিয়ে আসবেন। আর দেখতে আসলে খাওয়ানিটা দিতে হবে লাখে একটা খাওন। তাতেই বেশির ভাগ ছেলের বাবা-চাচারা পটে যান। খাওয়ানি দেখেই মেয়ের রূপ-বৈচিত্র্য কেমন তা দেখতে ভুলে যান তারা। এসবই ঘটকের আলাদা একটা তেলেসমাতি বৈশিষ্ট্য।
তবে মেয়ের বাবা যদি স্বর্ণ-গহনা দিতে কিছুটা কার্পণ্য করে থাকেন। তখন তিনি হঠাৎ করে বলে বসেন আজ থেকে মেয়ে আমার। এ মেয়ের স্বর্ণ-গহনা যা লাগে আমি দেব। এদিকে ছেলের বাবাকে মেয়ের জন্য স্বর্ণ-গহনা দেওয়ার পটভূমিটা আবার ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কোনো ছেলের বাবা যদি একটু স্বর্ণ কম দিতে চান তখন মেয়ের বাবাকে রাজি করাতে বলেন, ঠিক আছে মিয়া সাহেব স্বর্ণ ২০ ভরি চাইছেন ২০ ভরিই দেওয়া হবে। ১৫ ভরি আসল আর ৫ ভরি খাইট। তার এ কথাতেই মজলিসের সবাই হো হো করে হেসে উঠে আর রাজি হয়ে যায়। ঘটকের হাত দিয়ে কম করে হলেও হাজারের ওপর ছেলেমেয়ের জুড়ি বন্ধন হয়েছে। তার রয়েছে বিশাল নেটওয়ার্ক। আগে ঘটক চলাচল করতেন সাইকেল দিয়ে। মেয়ের পক্ষ থেকে ছেলের বাড়ি যেতে তার হাতে কয়েক শ টাকা খরচ বাবদ ধরিয়ে দিলেই তার দুই চাকার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি এখন নিজস্ব হোন্ডায় চলাচল করে থাকেন।
তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো- তার হাতে কয়েকটি সুন্দরী মেয়ে রয়েছে, তার জলসা ঘরের শোভা হিসেবেই তাদের আনাগোনা। বিশেষ খানাপিনার জন্য কেউ যদি মেয়ে দেখতে চায় তখন তাদের তিনি দেখিয়ে দেন। মেয়ে দেখে, খাওয়া-দাওয়ার পর যা বকশিশ পাওয়া যায় তা দিয়েই মজমায় চলে বিশেষ আয়োজন।
ঘটকের হাজার বিয়েতে রয়েছে হাজার রকমের অভিজ্ঞতা। সব ছেলে এসেই তার কাছে সুন্দর মেয়ে খোঁজ করে থাকেন। কিন্তু দেশের কালো-ধলো কোনো মেয়েরই তো বিবাহ বাকি থাকে না। কেউ শ্যামলা পছন্দ করেন আবার কেউ ধলা। কেউ লম্বা আবার কেউ খাটো। এ জগতে যদি সব মেয়েই ফর্সা আর সুন্দর হতো তাহলে অনেক মেয়ের বাবাকেই সমস্যায় পড়তে হতো। কারণ, সব ছেলেই ফর্সা পছন্দ করেন না। একেকজনের কাছে একেক ধরনের মেয়ে পছন্দ। জগৎজুড়ে বাহারি ধরনের মেয়ে সৃষ্টিকর্তা সৃজন করেছেন। তার আদল আর রূপের বলয়ে রয়েছে সৃষ্টির নিপুণ কারুকার্যময়তা।
তবে আমাদের শহরগুলোতে এখনো মেয়ে দেখানো নিয়ে রয়েছে প্রতারণার নানা কূটকৌশল। সেখানে নানা ধরনের প্রচারণা চালানো হয় সামাজিক যোগাযোগমাধমে। তাতেই প্রতারণার জালে সাধারণ মানুষ ফেঁসে যায়। কেউ বেকার ছেলেকে বিদেশ নিতে চায়। নিয়ে কারও কারও টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। আবার কোনো যুবতী সুন্দরী ডিভোর্সি মেয়ে বয়স্ক পাত্র চেয়ে মাকড়সার জালের মতো ফাঁদ পাতেন। সেখানেও চলে বড় ধরনের প্রতারণা। তাই বাস্তব জগতে একটি ভালো মেয়ে পাওয়া যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতোই। রূপলাবণ্যে যাই হোক। একটি সংসারী মেয়েই একটি ছেলের জীবন ধন্য করার মতো হতে পারে। কিন্তু এখন অনেক চাকরিজীবী মেয়ে বেশিদিন সংসার করতে পারেন না। তারা একা থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। তাদের বয়স হলেও বিয়েতে আগ্রহী হন না এখন। আবার বিয়ে করলেও তাদের ডিভোর্সের পরিমাণ আমাদের সমাজে অনেক বেশি।
অদূর ভবিষ্যতে চাকরিজীবী ৪৫ শতাংশ মেয়েই বিয়ে এবং মা হওয়া থেকে বিরত থাকার ভয়াবহতা গবেষণায় উঠে এসেছে। একজন ঘটকের ছেলেমেয়ের মেলবন্ধন আমাদের সমাজ থেকে বিলুপ্ত হতে বসেছে। ঘটকের আক্ষেপ আমাদের অনেক ভাবায়। এখন অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের চেয়ে লাভ ম্যারেজেই বেশি। ছেলেমেয়ে পালিয়ে বিয়ে করার ঘটনাও কম নয়। তাই তো আমাদের ঘটক ফেসবুক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর এখন বেজায় নাখোশ হয়েছেন। তাদের কারণেই তার ব্যবসায় এখন লালবাতি জ্বলার উপক্রম হয়েছে।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)