আশির দশকের শেষের দিকে। তখনো দেশের সড়ক পথের যাতায়াত এতটা সহজ ও বর্ণিল ছিল না। নদ-নদী ছিল অনেক বড় বড়। বড় নদী পাড়ি দিতে তখন একমাত্র ভরসা ছিল ফেরি ব্যবস্থা। তাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরি ঘাটেই অতিবাহিত হতো। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো বড় নদীগুলো যাত্রীবাহী বাস ফেরিতেই পারাপার হতে হতো।
তবে আমরা সদরঘাট থেকে লঞ্চযোগে নদীপথেই দক্ষিণাঞ্চলের মাদারীপুরের গ্রামের বাড়িতে যেতাম। তখনকার সময়ে ভাড়া ছিল ১০ টাকা। রাত ৮টায় সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ত। আমরা মাদারীপুরের আগের স্টেশন হোগলপাতিয়া ঘাটে নামতাম। ঘাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ১০টা। তখনকার লঞ্চগুলো ছিল কাঠ বডি। নদী বড় কিন্তু লঞ্চ ছিল ছোট। মেঘনা ও পদ্মা পাড়ি দিলেই লঞ্চের দুলুনি বলে দিত এখন লঞ্চ মেঘনা পাড়ি দিচ্ছে। আবার পদ্মার ঘূর্ণি স্রোতের ছিল আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। নদীর ঘূর্ণি স্রোতে পড়ে কত লঞ্চ-নৌকা ডুবেছে তার যেন কোনো ইয়ত্তা নেই। তবে ধীরে ধীরে নব্বই দশকের শেষের দিকে বড় বড় কোম্পানির লঞ্চ এ পথে চলা শুরু করে।
ঢাকা-মাদারীপুর লাইনে একক মালিকের আধিপত্যের পতন শুরু হয় তখন। এ লাইনে বড় বড় লঞ্চের আবির্ভাব ঘটে মূলত নব্বই দশকের মাঝামাঝি। লঞ্চ যত বড়ই হোক না কেন- নদীপথে বর্ষার মৌসুম ছিল খুবই ভয়ের। অভিজ্ঞ চালকরা পর্যন্ত পদ্মা-মেঘনা পাড়ি দিতে হিমশিম খেতেন। মেঘনা নদীর আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো আকাশে মেঘ না থাকলেই মেঘনার গর্জন থাকত ভয়াবহ। মেঘনার ষাটনল এবং পদ্মার মোহনায় পৌঁছানোর আগের পথটুকু ছিল নদীপথের সবচেয়ে বিপজ্জনক এরিয়া। তার পর পদ্মার মোহনা ছিল ঘূর্ণির তীর্যক বাক। ত্রিমুখী নদীর স্রোত এসে চাঁদপুর মোহনায় মূলত ঘূর্ণিস্রোত তৈরি হতো। এখানে অভিজ্ঞ মাঝির অভিজ্ঞতার খেলা দেখানোর কসরত থাকত। এখানে লঞ্চ চালাতে হলে বাতাসের ভাষা বুঝতে হতো। বাতাসকে ব্যবহার করে বড় বড় লঞ্চ পানি কেটে এগিয়ে যেত। তবে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় হলে চালকরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। আর তাতেই ঘূর্ণির তোড়ে অনেক লঞ্চের মানুষসহ সলিল সমাধি ঘটত।
একবার একা রওনা দিয়েছি। সন্ধ্যার আকাশ শান্ত। তখন ছিল গ্রীষ্মকাল। সন্ধ্যায় আকাশ শান্ত থাকলেও রাত ১১টায় লঞ্চ যখন মেঘনা নদীতে এসে পৌঁছায় আর তখনি আকাশ কালো করে মেঘ গর্জাতে থাকে। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে শুরু হলো ঝড়ের তীব্রতা। লঞ্চ একবার পানির নিচে যাচ্ছে আবার ভেসে উঠছে। লঞ্চের ভেতর থাকা নারী ও শিশু যাত্রীদের কান্নায় একাকার হয়ে যাচ্ছে। তবে ঝড় হলে লঞ্চে থাকা পর্দাগুলো ওপরে তুলে দেওয়া হয় যাতে বাতাস একদিক দিয়ে প্রবেশ করে অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে।
লঞ্চ দুলুনি খাচ্ছে। বড় বড় ঢেউ এসে লঞ্চের ফ্লোর ভিজিয়ে দিচ্ছে। এতে আতঙ্ক আরও বেড়ে যাচ্ছে। কেউ আজান দিচ্ছে। কেউ শেষবারের মতো কালিমা পড়ে নিচ্ছে মরার আগে। আবার কেউ দোয়া ইউনুস আওড়াচ্ছে। তবে এ সময় লঞ্চের চালক এবং ইঞ্জিন অপারেটর থাকেন বীরের মতো দাঁড়িয়ে। তাদের হাতের ওপর অনেক মানুষের জীবন। যতই বিপদ আসুক না কেন তারা কখনোই হাল ছেড়ে দিতে পারেন না। এ জন্য অনেক লঞ্চের ইঞ্জিন অপারেটর লঞ্চ দুর্ঘটনায় পড়লে আর বাঁচতে পারে না। তাই ঝড়ে লঞ্চ যখন মেঘনার ষাটনল অতিবাহিত হচ্ছে তখন আর ভেতরে থাকলাম না। চলে এলাম লঞ্চের সামনে। জামা-প্যান্ট খুলে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। লঞ্চ ডুবে ডুবে অবস্থা। তীব্র বাতাস। সেই সঙ্গে বৃষ্টি। লঞ্চ একবার নিচে যায় আবার ওপরে ওঠে। এক ঘণ্টা ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে চাঁদপুর ঘাটে এসে ভিড়ে লঞ্চ।
এমন করুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে যেতে হয়। চাঁদপুর ঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়েই পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয়। তারপর গ্রামীণ অনেক জনপদ পড়ে। সেখানে কোনো লঞ্চ ভেড়ার জন্য পল্টুন নেই। নদীপাড়ের মাটিতেই লঞ্চ ধাক্কা খেয়ে ভিড়ে যায়।
এক লঞ্চকে আরেক লঞ্চ টেক্কা দিতে নতুন নতুন কোম্পানি বিভিন্ন ধরনের ভাড়া অফার করত তখন। একসঙ্গে দুটি লঞ্চ চলত। মাদারীপুর থেকে একসঙ্গেই তখন দুটি লঞ্চ ছাড়ত। যখন ভাড়া ৫০ টাকা হলো- তখন নতুন লঞ্চকে টেক্কা দিতে পুরোনো লঞ্চ ভাড়া করত ১০ টাকা। আর নতুন লঞ্চ বলত একদম ফ্রি। তবে লঞ্চে উঠলে ওই ১০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। এভাবেই প্রতিযোগিতা ছিল লঞ্চপথের।
তবে বর্ষার মৌসুমে নদীপথ বিপজ্জনক হলেও শীতে লঞ্চে ছিল চলাচল আরামদায়ক। তখন নদীতে পানি কম থাকে। নদী থাকে সম্পূর্ণরূপে শান্ত। তখনকার সময়ে গ্রামীণ জনপথের সড়কগুলো ছিল মাটির। উন্নয়নের ছোঁয়া একদমই লাগেনি। তাই নদীপাড়ের মানুষের কাছে লঞ্চপথই ছিল একমাত্র বাহন।
সড়কপথের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই লঞ্চমালিকরা যাত্রী সংকটে ভুগছেন। তখনকার সময়ে ঢাকা থেকে মাদারীপুর যেতে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী-১, ধলেশ্বরী-২, পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ সহ অনেকগুলো ফেরি পাড়ি দিতে হতো। তাতে ফেরির লাইন পেতে পেতেই দীর্ঘ সময় চলে যেত। তাই সড়কপথের যাতায়াত অতটা নির্ভীক আর আরামদায়ক ছিল না। তাই মানুষ যাতায়াতের জন্য লঞ্চকে বেছে নিত। তবে ফারাক্কার বাঁধের কারণে দেশের বড় বড় নদী এখন শুকিয়ে গেছে। নদীর মাঝখানে পড়েছে বিরাট চর। বর্ষায় নির্বিঘ্নে লঞ্চ চলতে পারলেও শুকনো মৌসুমে লঞ্চ নদীর চরায় আটকা পড়ে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। মধ্যরাতে পদ্মা মাঝখানে চরে আটকা পড়ে লঞ্চ একদিক কাত হয়ে পড়ায় মানুষকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
নদীপথে চলতে গিয়ে জীবনে অনেক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। ঢাকা থেকে রাত ৮টায় ছেড়ে হোগলপাতিয়া ঘাটে পৌঁছাতাম সকাল ৯টা-১০টায়। আর শীতে যদি কুয়াশা পড়ত তখন দুপুর হয়ে যেত। তবে বাড়ি পৌঁছাতে আড়িয়াল খাঁ বড় নদী থেকে ছোট নদী দিয়ে যেতে হতো। ঘাটে পৌঁছেই তখন নৌকা পেতাম। হোগলপাতিয়া থেকে বাঙ্গাবাড়িয়া তিন থেকে চার মাইল যেতে তখনকার সময়ে আমাদের ভাড়া দিতে হতো আট টাকা। সেই নৌকাকে বলা হতো এক মালাই নৌকা। বড় নদী ছেড়ে ছোট নদীতে প্রবেশ করতেই নৌকার মাঝিকে পাড়ের কৃষকরা জিজ্ঞাসা করতেন ভাড়া কততে এসেছো? গ্রাম্য ভাষায় মাঝি বলত ৮০০ টাহা। এটা শুনে কৃষকরা অবাক হতো। এত টাকা ভাড়া।
বর্তমানে নদীগুলো শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। সড়ক পথের উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। বড় বড় নদীতে এখন আর ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। সব নদীতেই এখন ব্রিজ হয়ে গেছে। লঞ্চে এখন যাত্রী নেই। একটা বড় লঞ্চ ঢাকা থেকে আসা যাওয়া করতে কয়েক লাখ টাকার তেল লাগে। খরচ বেশি কিন্তু যাত্রী কম। তাই তো এ লাইনে এখন লঞ্চ চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ঢাকা বরিশাল লাইনে চলছে আগের চেয়ে অর্ধেক লঞ্চ। অনেক মালিক লঞ্চ কেটে লোহা দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। যাত্রী না থাকায় বড় ধরনের লোকসান দিতে হচ্ছে তাদের। তাই তো লঞ্চ না ভেঙে মালিকদের আর বিকল্প কোনো পথও খোলা নেই। এভাবেই লঞ্চ পথের সোনালি দিনগুলো আমাদের হারিয়ে গেছে। সড়কপথ যতই আধুনিক এবং বৈচিত্র্যময় হোক না কেন, আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য নদীপথের বিকল্প এখনো কিছু গড়ে উঠেনি।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)