সমুদ্রের তলদেশ হলো মহাকাশের মতোই রহস্যময়। সেই গভীর সমুদ্রে আছে জানা-অজানা নানা প্রজাতির প্রাণীর বাস। এদের মধ্যে এমন কিছু ক্ষুদ্র প্রাণী আছে, যাদের ক্ষমতা দেখলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। তেমনই একটি প্রাণী হলো ‘পিস্তল চিংড়ি’ বা স্ন্যাপিং শ্রিম্প (Snapping Shrimp)। আপাতদৃষ্টিতে ছোট্ট এই প্রাণীকে নিরীহ ভাবলেও এই জলজ প্রাণীটি তার আকারের তুলনায় ভয়ংকর শক্তি প্রদর্শন করে থাকে। এর ক্ষমতা এতটাই তীব্র, যা আমাদের কল্পনাকেও থামিয়ে দেয়।
পিস্তল চিংড়ির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর একটি অস্বাভাবিক বড় ও বিশেষায়িত থাবা। এই থাবাটি অনেকটা পিস্তলের চেম্বারের মতোই দেখতে। শিকারকে ধরার সময় বা শত্রুকে ভয় দেখানোর জন্য চিংড়িটি যখন অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে এই থাবা বন্ধ করে, তখন একটি শক্তিশালী কম্পন ঘটে। থাবার দ্রুতগতির কারণে পানিতে এক ধরনের পানির ধারা বা Water Jet তৈরি হয়, যা প্রায় ২৫ মিটার/সেকেন্ড বা ৯০ কিলোমিটার/ঘণ্টা বেগে বাইরে বেরিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়াটির ফলে একটি ‘ক্যাভিটেশন বাবল’ বা বুদবুদ সৃষ্টি হয়। এই বুদবুদটি সৃষ্টি হওয়ার কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে প্রচণ্ড চাপ ও গতিতে এটি একটি ভয়ংকর ‘শকওয়েভ’ তৈরি করে। এই শকওয়েভ বা তরঙ্গ এতটাই তীব্র হয়ে থাকে যে, এর শব্দ প্রায় ২০০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যা তুলনা করলে একটি বন্দুকের গুলির শব্দের থেকেও অনেক বেশি।
কিছু প্রজাতির পিস্তল চিংড়ির শব্দ ২১৮ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। এই তীব্র শব্দই প্রাণীটিকে ‘স্ন্যাপিং শ্রিম্প’ নাম দিয়েছে। শব্দ ছাড়াও এই বুদবুদটির সময় এর চারপাশে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা সৃষ্টি হয়। এই সময় বুদবুদের অভ্যন্তরের পানির তাপমাত্রা প্রায় ৪ হাজার ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮ হাজার ৪৯২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার অর্থাৎ ৫ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি! যদিও এই তাপমাত্রা খুবই ক্ষণস্থায়ী, তবে এই শব্দ এবং তাপের সম্মিলিত আঘাত তার শিকার যেমন- ছোট মাছ বা অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীদের মুহূর্তের মধ্যে অজ্ঞান বা মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। চিংড়িটি তখন সহজেই শিকারকে টেনে তার গর্তে নিয়ে যায় খাবার হিসেবে।
পিস্তল চিংড়ির কলোনিগুলো সমুদ্রের তলদেশে বিশাল শব্দ তৈরি করে। এদের ক্রমাগত শব্দ সমুদ্রের পানিতে কম্পন ধরায় এবং তা কখনো কখনো নৌবাহিনীর সাবমেরিনগুলোর সোনারেও ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপকূলবর্তী অঞ্চলের প্রবাল প্রাচীর বা সামুদ্রিক ঘাসের শেওলা পরিবেশে এই প্রাণীগুলোর উপস্থিতি একটি সুস্থ ইকোসিস্টেমের নির্দেশক। এই চিংড়িগুলো প্রবাল প্রাচীর বা গর্তের মধ্যে বাস করে।
পিস্তল চিংড়ি তার ক্ষুদ্রাকৃতি এবং অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণে প্রকৃতির এক বিস্ময়। সামান্য একটি চিংড়ি যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এমন বিধ্বংসী ক্ষমতা ধারণ করতে পারে, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এক গবেষণার বিষয়। এ প্রাণীটি শুধু শিকারি হিসেবেই ভয়ংকর নয়, বরং এর ক্ষমতা নতুন প্রযুক্তির বিকাশেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা পিস্তল চিংড়িকে প্রকৃতির সবচেয়ে ছোট কিন্তু ভয়ংকর প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তারেক/
.jpg)
.jpg)