বন্ধুরা মাঠজুড়ে দৌড়াত, ব্যাট-বলে তাল মেলাত, হাত বাড়িয়ে একে অন্যকে সাহায্য করত। সেই দৃশ্য দূর থেকে চেয়ে দেখত ছোট্ট আলী- হাত দুটো নেই বলে তাদের সঙ্গে ছুটে যেতে পারে না, খেলায় ছুঁয়ে দিতে পারে না নিজের ইচ্ছাগুলোকে। মনের ভেতর তখন জমে উঠত একধরনের তীব্র শূন্যতা, দুঃখে ভিজে যেত শিশুমন।
কিন্তু গল্পটা এখানে থেমে যায়নি- দুঃখই তার ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে, শক্তির ভিত হয়ে ফুটে উঠেছে অন্যরকম এক আস্থা। হাত ছাড়াই দুই পা দিয়ে জীবনকে শাসন করতে শেখা এই তরুণ প্রতিদিন নতুন করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। দুই পা দিয়েই তিনি লিখেন, খাবার খান, পড়েন- করতে পারেন প্রায় সব কাজ। আর পা দিয়ে লিখেই সম্প্রতি চট্টগ্রাম সরকারি সিটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমবিএ পাস করেছেন তিনি।
জীবনের প্রতিটি ধাপে লড়াই করা এই মানুষটির নাম মোহাম্মদ আলী। জন্ম চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া ইউনিয়নের দুর্গম হরিদাঘোনা গ্রামে । দুই বোন ও দুই ভাইয়ের সবার ছোট আলী। বাবা আমিন শরীফ একজন ব্যবসায়ী, মা শামসুন্নাহার গৃহিণী। পরিবার, পাহাড়ঘেরা গ্রাম আর সীমাবদ্ধতাকে জয় করে আলী আজ অসংখ্য মানুষের অনুপ্রেরণা।
জন্ম থেকেই তার হাত নেই। একটু বড় হওয়ার পর যখন দেখলেন সবার হাত আছে তার হাত নেই। তখন পা দিয়েই সব কাজ করার চেষ্টা করতে লাগলেন। শুরুর দিকে পা ব্যথা হয়ে যেত। ধীরে ধীরে দুই পা-ই যেন তার দুই হাত হয়ে উঠল। আলী নাছোড়বান্দা। কষ্ট হলেও তিনি লেগে থাকলেন। তার প্রাত্যহিক কাজে সব সময় মা সাহায্য করেন। বাবা সাহস জোগান। তুমি পারবে বলে মাথার ওপর বাবা হাত রাখলে আলী মানসিকভাবে আরও শক্ত হয়ে উঠতেন।
ছোটবেলা থেকেই আলীর পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ। তাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে গেলে অনেকেই রাজি হয়নি। অবশেষে সেনেরহাট উচ্চবিদ্যালয় থেকে ৩ দশমিক ৫৬ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সাতকানিয়া সরকারি কলেজ থেকে ২ দশমিক ৮৩ পেয়ে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন চট্টগ্রাম সরকারি সিটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। এই কলেজ থেকেই সম্প্রতি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ২ দশমিক ৩৮ পেয়ে এমবিএ পাস করেন। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আলীর জীবনে আনন্দের গল্পও আছে। আলী বলেন, প্রতিটি পরীক্ষার যখন রেজাল্ট দিত। দেখ?তাম আমি পাস করেছি। তখন খুব ভালো লাগত। দুঃখ বলতে শুধু অন্যের মতো হাত দিয়ে কাউকে সাহায্য করতে না পারা। হাতের অভাবে চাইলেও অনেক কাজ আমি সবার মতো করতে পারি না।
যে ছেলের হাতই নেই, তাকে দিয়ে আবার পড়াশোনা হবে নাকি —এমন অনেক কথা প্রায়ই আলীর মাকে শুনতে হয়েছে। কিন্তু তিনি যেন জানতেন আলী হাত না থাকলেও আর দশজনের মতো এগিয়ে যাবে। মানুষের কথায় তিনি কান না দিয়ে ছেলের পাশে থেকেছেন সব সময়। শুধু আলীর মা-ই নন। বন্ধুদের কাছ থেকেও আলী সাহায্য পেয়েছেন। নাহিদ মিয়া নামে এক বন্ধুর বাসায় থেকে আলী এমবিএ পরীক্ষা দিয়েছেন। এই বন্ধুর কাছে আলীর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আলী বলেন, পরিবার, বন্ধুবান্ধব সবার থেকে সহযোগিতা পাওয়ার কারণে আমার আজকের এই অবস্থানে আসা অনেকটাই সহজ হয়েছে।
পড়াশোনার বাইরে আলী অন্য অনেক কাজও শিখেছেন। তিনি কম্পিউটারে এমএস ওয়ার্ড, এক্সেলের কাজ পারেন। এক বড় ভাই আলীকে একটি কম্পিউটার উপহার দিয়েছিলেন অনেকদিন আগে। সেটাতেই তিনি নানা কাজ শিখেছেন।
ছোটবেলা থেকে আলীর স্বপ্ন একটি সরকারি চাকরি করা। এই স্বপ্ন পূরণে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষাও দিয়েছেন তিনি। একটি চাকরির আবেদন তার সবার কাছে।
আলী সম্পর্কে সাতকানিয়া সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক আব্দুল হামিদ বলেন, মো. আলীর দুটি হাত নেই, তারপরও অনেক সংগ্রাম করে সে পড়াশোনা করেছে। অনেক কষ্ট করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করত। তার বিবিএ ও এমবিএর ফলাফল খুবই সন্তোষজনক। এ রকম সংগ্রাম করে পড়াশোনা করা একটি ছেলে দেশের সম্পদ। তার কম্পিউটার জ্ঞান ভালো। একটি সরকারি চাকরি পেলে সে পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারবে। সে দেশের সম্পদে পরিণত হবে- এমনটাই আশা করি আমরা।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মো. আলীর মতো অদম্য ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ছেলেরা আমাদের গর্ব। এদের ক্ষেত্রে আমাদের আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা সব সময় আছে। সে যাতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সে ব্যাপারে আমরা তাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে যাব। কঠোর সংগ্রামী এমন প্রতিবন্ধীদের পাশে থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তার পরিবার একটি আবেদন দিলে সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)