বিশ্বের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের রহস্যে ঢেকে থাকা স্থানগুলোর মধ্যে শীর্ষে আছে চীনের প্রথম সম্রাট চিন শি হুয়াংয়ের সমাধি। খ্রিষ্টপূর্ব ২২১ সালে পুরো চীনকে একক রাষ্ট্রে রূপ দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করেন তিনি। তার মৃত্যুর পর তৈরি হয় ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও বিস্ময়কর রাজকীয় সমাধি। যেখানে রয়েছে টেরাকোটার আর্মির মতো যুগান্তকারী আবিষ্কার। তবে দীর্ঘদিন ধরেই যে রহস্যটি গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল তা হলো সমাধির ভেতরে থাকা সম্ভাব্য পারদের নদী। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া নতুন প্রমাণ সেই রহস্যকে আরও দৃঢ় করেছে।
প্রাচীন চীনা গ্রন্থ শি-জি-এর বিবরণে পাওয়া যায়, সম্রাটের সমাধির ভেতরে পৃথিবীর প্রতীক হিসেবে নকল পাহাড়, নদী, সাগর এমনকি নক্ষত্রের মানচিত্র আঁকা হয়েছিল। সেই নদী-সমুদ্রকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে ব্যবহৃত হয়েছিল তরল পারদ। ধারণা করা হয়, পারদের ধারা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন তা স্থিরভাবে প্রবাহিত হচ্ছে সম্রাটের ক্ষমতা, তার সাম্রাজ্য এবং অমরত্বের প্রতীক হিসেবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এই দাবিকে আরও জোরালো করেছে। সমাধির আশপাশের মাটি ও বায়ুতে পাওয়া গেছে অস্বাভাবিক মাত্রায় পারদ, যা প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দূর থেকে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সমাধির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বের হচ্ছে পারদের বাষ্প। একে গবেষকরা সমাধির ভেতরে থাকা বিশাল পরিমাণ পারদের উপস্থিতির ‘পরোক্ষ প্রমাণ’ বলে মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল প্রতীকী ব্যবহারের জন্যই নয় এমন উচ্চমাত্রার পারদ ভেতরের ধাতব শিল্পকর্ম, কাঠামো ও সমাধির স্থায়িত্ব রক্ষার এক ধরনের প্রাচীন পদ্ধতিও হতে পারে। কিছু ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন, সম্রাট নিজের দেহকে অমর করে রাখার প্রচেষ্টায়ও পারদকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যদিও আজকের বিজ্ঞানে জানা গেছে, অতিরিক্ত পারদ প্রাণঘাতী তবু সেই সময় পারদকে দেখা হতো শক্তি ও দীর্ঘায়ুর উৎস হিসেবে।
তবে এসব রহস্যের সমাধান জানা সত্ত্বেও সমাধির মূল চেম্বার এখনো খোলা হয়নি। কারণ, সমাধির ভেতরে থাকা কাঠের শিল্পকর্ম হাজার বছর ধরে আটকে থাকার পর খোলা বাতাসে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। তার ওপরে বিপুল পরিমাণ পারদের উপস্থিতি গবেষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চীনা সরকার ঘোষণা করেছে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ক্ষতি ছাড়াই সমাধির ভেতরের জিনিসপত্র তুলে আনা সম্ভব হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সমাধি অবিকৃত থাকবে।
বর্তমান গবেষণা মতে এটুকু বলা যায় চিন শি হুয়াংয়ের সমাধির ভেতর সত্যিই এমন কিছু রয়েছে, যা প্রাচীন কিংবদন্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এই সমাধি তাই আজও বিজ্ঞানী, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে রহস্যের ভাণ্ডার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তারেক/
.jpg)