২৫ ডিসেম্বর খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব 'শুভ বড়দিন'। একে ক্রিসমাস বলা হয়।ক্রিসমাস শব্দটি এসেছে প্রাচীন ইংরেজি ক্রিস্টেস ম্যাসেস থেকে। যার প্রকৃত অর্থ হল ক্রিসমাস ভর। সারা বিশ্বের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষেরা ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা ও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করেন। বড়দিন উপলক্ষে দুই ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয় আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক। আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিশেষ প্রার্থনা করা। বাহ্যিক প্রস্তুতি হিসেবে ক্রিসমাস ট্রি , আলোকসজ্জা, কেক কাটা।
আজকের আয়োজনে বড়দিনের নানা দিক তুলে ধরা হলো-
ক্রিসমাস কেক
কেক ছাড়া ক্রিসমাস চিন্তা করা যায় না। আপনি কি জানেন ৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন প্রথম ক্রিসমাস পালন করা প্রচলন শুরু করেন। তখন এমন ঘটা করে কেক খাওয়ার রীতি ছিল না। সেই সময় ক্রিসমাসের আগের দিন উপবাস করার নিয়ম ছিল। লোকজন সেই একদিনের উপবাস ভাঙতেন প্লাম পরিজ খেয়ে। ইংরেজরা পরিজের মিশ্রণে শুকনো ফল, মসলা ও মধু মিশিয়ে ক্রিসমাস পুডিং বানিয়ে খেতে লাগলেন। পরবর্তীতে সেই শুকনো ফল ও মসলা মধ্যে ময়দা ব্যবহার করে কেক তৈরি হলো। ‘ক্রিসমাস কেক’ নানা দেশে নানা ভাবে খাওয়া হয়, এই যেমন ফ্রান্স ও লেবাননের ট্র্যাডিশনাল ক্রিসমাস কেক কে ‘বুশ ডি নোয়েল’ নামে ডাকা হয়। এতে অবশ্য কোনও ফল থাকে না।ইংল্যান্ডে বড়দিনে ‘ইউল লগ’ বা ‘চকোলেট লগ’ নামে কেক খাওয়ার রীতি রয়েছে। জার্মানে স্টোলেন নামের ফ্রুটকেক জনপ্রিয়। ক্রিসমাসে যা ক্রিস্টোস্টোলেন নামে পরিচিত। ইতালিতে বড়দিনে প্যানেটোন নামে এক বিশেষ ধরনের কেক বানানো হয়। এর স্বাদ একটু টক। সাইপ্রাসের বড়দিনে স্থানীয় মানুষ অতিথিদের সাইপ্রিয়ট কেক খাইয়ে থাকেন। জাপানের ক্রিসমাস কেক ফ্রস্টেড স্পঞ্জি। এতে থাকে স্ট্রবেরি, চকোলেট আর ফল।
ক্রিসমাস ট্রি
বড়দিনের ক্রিসমাস ট্রি। চিরসবুজ এমন গাছের ব্যবহার শুরু হয়েছিল যিশুখ্রিষ্টের জন্মের আগেই। প্রাচীনকালে শীতপ্রধান দেশের মানুষ পাইন বা দেবদারুগাছকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মনে করত। তবে আমরা যে ক্রিসমাস ট্রি দেখি সেটার ব্যবহার শুরু ষোড়শ শতাব্দীতে জার্মানিতে। সে সময় জার্মান খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা বড়দিনের উৎসবে বাসায় কাঠ ও সবুজ পাতার তৈরি একধরনের ক্রিসমাস পিরামিড রাখতেন। এরপর প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারক মার্টিন লুথার ক্রিসমাস ট্রির সঙ্গে প্রথম মোমবাতি ব্যবহারের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু ১৮৪৬ সালে রানি ভিক্টোরিয়া ও জার্মান রাজপুত্র অ্যালবার্ট সন্তানদের নিয়ে ক্রিসমাস ট্রির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। সেই ছবি ছাপা হয়েছিল ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ পত্রিকায়।ছবি প্রকাশের পর দ্রুতই যুক্তরাজ্যে ক্রিসমাস ট্রির জনপ্রিয়তা পায়। বিশ শতকের শুরু থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলোতেও খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের কাছে বড়দিন উদযাপনে ক্রিসমাস ট্রি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
জিঙ্গল বেল জিঙ্গল বেল গানের ইতিহাস
জিঙ্গল বেল জিঙ্গল বেল জিঙ্গল অল দ্য ওয়ে গানটি আমেরিকান লেখক জেমস লর্ড পিয়েরপয়েন্ট লিখেছিলেন মুলত থ্যাক্স গিভিং সং হিসেবে। ১৮৫৭ সালে ‘ইন আ হর্স ওপেন স্লেই’ অ্যালবামে এই গান প্রকাশ পেলে গান সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৮৯ সালে এডিসন রেকর্ডারে এই গানটি প্রথম রেকর্ড করা হয়েছিল। কেউ কেউ মনে করেন রবিবার গির্জায় সমাবেশে গাওয়ার জন্য এই গানটি লিখে সুর করেছিলেন তিনি। তবে সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তার কারণেই ১৯৬০ সালে গানটি বড়দিনের অনুষ্ঠানে গাওয়া শুরু হয়।
সান্তা ক্লজ
সান্তা ক্লজ পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কিংবদন্তি চরিত্র ছিলো সেন্ট নিকোলাস নামের একজন ধর্মযাজক। তিনি খুবই দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর সম্পদ অসহায় গরিব মানুষের সাহায্যে ব্যয় করতেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী,নিকোলাস ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ও মধ্যরাতে ছেলেমেয়েদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে উপহার দিতেন। সান্তার রঙিন পোশাকের সূচনা হয় ১৮২৩ সালে আমেরিকার লেখক ক্লেমেন্ট ক্লার্ক মুরের লেখা অ্যা ভিজিট ফর্ম সেন্ট.নিকোলাস কবিতার মাধ্যমে। শুধু পোশাক নয় আটটি হরিণটানা গাড়ি করে শিশুদের উপহার দেওয়ার ধারণা দেওয়া হয় কবিতাতে। সেই কবিতা অনুযায়ী আমেরিকান কার্টুনিস্ট থমাস ন্যাসট ১৮৮১ সালে কার্টুন আকেঁন। তার আঁকা কার্টুন পত্রিকায় ছাপা হলে সান্তা ক্লজের সাজ ব্যাপক খ্যাতি পায়।
বড়দিনে দেশে দেশে কিছু অদ্ভুত নিয়ম রয়েছে। নরওয়ের পুরাণে প্রচলিত আছে যে ক্রিসমাসের সন্ধ্যেয় ডাইনিরা ঝাড়ুতে করে আকাশে উড়ে বেড়ায়। তাই ক্রিসমাসের আগের দিন নরওয়েবাসীরা সব ঝাড়ু লুকিয়ে রাখে যাতে ডাইনিরা তাদের প্রিয় বাহন খুঁজে পেতে না পারে। এদিকে ক্রিসমাসে পর্তুগালে ডিনার টেবিলে অতিরিক্ত খাবারের প্লেট রাখা হয়। তারা বিশ্বাস করে মৃত প্রিয়জনেরা এই দিন তাদের সাথে একসঙ্গে খাবার খেতে আসেন। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার বড়দিন পালন একদমই ভিন্ন। এই সময় বহু মানুষ ভুত বা শয়তানের প্রতীক সেজে শিশুদের ভয় দেখানো হয় । সাউথ আফ্রিকায় পৃথিবীতে সব থেকে অদ্ভুতুড়ে ক্রিসমাস স্পেশাল খাবার খেয়ে থাকে। ক্রিসমাসের সব থেকে জনপ্রিয় খাদ্য হল শুঁয়োপোকা ভাজা। এগুলো সাধারণ শুঁয়োপোকা নয়। এই পোকা গুলো হলো পাইন ট্রি এম্পেরার মথ অথবা ক্রিসমাস ক্যাটারপিলার। এই খাবার খাওয়া পিছনে কারণ হলো তারা বিশ্বাস করে এই পোকার স্বাদ আগামী বছরের ভালো সময়ের প্রতীক।
তারেক/
.jpg)