ইসলামে হজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য জীবনে একবার হলেও হজ করা ফরজ। প্রত্যেক মুসলমানের মনেই সুপ্ত বাসনা থাকে জীবনে একবার হলেও হজ পালন করার। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ হজ পালন করেন। হজ পালন করেন নানা বর্ণ, গোত্রের মানুষ। ইতিহাসে হজ পালন করেছেন অনেক বিখ্যাত মানুষজন। তবে হজ পালন করে বিখ্যাত হয়েছেন এক সম্রাট। আফ্রিকা মহাদেশের দেশ মালির শাসক ‘মানসা মুসা’। ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো।
আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন মানসা মুসা। ‘মানসা’ শব্দটি স্থানীয় ভাষায় সম্রাট বা সুলতান বোঝায় এবং মানসা মুসার পুরো নাম ছিল ‘মুসা কিতা’। ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী মুসা ১৩১২ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে মালি সাম্রাজ্যের শাসক হন। তিনি তার সময়ের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং সম্রাট হিসেবে বিবেচিত হন। তার ধনসম্পদের মূল উৎস ছিল স্বর্ণ ও খনিজ লবণের বাণিজ্য। তৎকালীন বিশ্বের স্বর্ণ ও লবণের অর্ধেকই মালি সাম্রাজ্য থেকে আহরিত হতো এবং মানসা মুসা এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে অগাধ সম্পদের মালিক হন। তিনি প্রথম আফ্রিকান শাসক ছিলেন, যিনি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তার উপাধির মধ্যে ছিল ‘প্রথম মুসা’, ‘মালির আমির’, ‘ওয়াঙ্গারা খনির সম্রাট’, ‘কনকান মুসা’, ‘মালির সিংহ’ ইত্যাদি।
মানসা মুসা একজন ধার্মিক মানুষ ছিলেন। তিনি ভুলবশত তার মাকে হত্যা করেছিলেন, যার জন্য তিনি গভীর অনুশোচনায় ভুগতেন। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তিনি ব্যাপক দান করতেন এবং সারা বছর রোজা রাখতেন। তবু মানসিক শান্তি না পেয়ে তিনি আলেমদের পরামর্শে হজ পালনের সিদ্ধান্ত নেন। আলেমরা তাকে মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা পরিদর্শনের পরামর্শ দেন, যাতে তিনি ক্ষমা পান।

মানসা মুসা ১৩২৪ থেকে ১৩২৫ সালে হজযাত্রায় বের হন। মালিতে তার রাজত্বকাল ছিল ১৩১২ থেকে ১৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। তার শাসনামলকে মালি সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই মুসলিম সম্রাট ১৩২৪ সালে হজ পালনে যাত্রা শুরু করেন। আফ্রিকা থেকে মক্কায় যেতে তখন প্রায় এক বছরের মতো সময় লেগেছিল। এই দীর্ঘ পথে তিনি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ পাড়ি দেন। নাইজার নদী, তাঘাজা, মধ্য আফ্রিকা, মিসর পাড়ি দেন। যাত্রাপথে তার সঙ্গে ছিল ৬০ হাজার মানুষের বিশাল কাফেলা। এর মধ্যে ছিলেন তার প্রথম স্ত্রী, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং সরকারি কর্মকর্তারা। ছিলেন সেনা ও ক্রীতদাস। তার সঙ্গে ছিল শত শত উট। যা স্বর্ণের বার বহনকারী ছিল। তিনি বিশাল সম্পদ নিয়ে বেরিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক বিবরণ মতে, তার যাত্রা আশপাশের প্রতিটি অঞ্চলকে অবাক করে দেয়। তার কাফেলা এত বিশাল ছিল যে, পুরো কাফেলাটিকে একটি নির্দিষ্ট স্থান অতিক্রম করতে কয়েক দিন সময় লেগেছিল।
তার দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি প্রচুর দান করেছিলেন। মুসা যখন সাহারা পেরিয়ে কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, মদিনা এবং অবশেষে মক্কার দিকে ভ্রমণ করেছিলেন তখন তিনি অসাধারণ উদারতা প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি যেখানেই গেছেন দরিদ্র এবং স্থানীয় নেতাদের মধ্যে স্বর্ণ বিতরণ করেছেন। বণিকদের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে পণ্য কিনেছিলেন। বলা হয় যে, প্রতিটি প্রধান স্থানে মসজিদ এবং প্রার্থনার স্থান নির্মাণ করেছিলেন।
কিছু ইতিহাসবিদের মতে, তার স্বর্ণের দান এতটাই বিশাল ছিল যে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে মিসরে, যেখানে তার সফরের পর বছরের পর বহু বছর ধরে স্বর্ণের দাম নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছিল। মিসরে পৌঁছানোর পর, মানসা মুসা তিন দিন পিরামিডের কাছে তাঁবু খাটেন। এরপর তিনি তিন মাসের জন্য কায়রোতে স্থায়ী হওয়ার আগে মিসরের সুলতানকে ৫০ হাজার দিনার উপহার পাঠান। সুলতান মুসাকে তার প্রাসাদ ধার দিয়েছিলেন। মানসা মুসা এত বেশি স্বর্ণ ব্যয় করেন যে, মিসরের বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং অর্থনীতিতে ধস নামে। ফেরার পথে তিনি উচ্চ সুদে স্বর্ণ ধার করে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে মিসরের স্বর্ণের বাজার স্বাভাবিক হতে প্রায় এক দশক লাগে।
মানসা মুসার যাত্রা শুধু হজ যাত্রাই ছিল না। এটি ছিল মানসার মুসার ঐশ্বর্য, প্রভাব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে মালির মর্যাদা বৃদ্ধির যাত্রা। তাই মানসা মুসার সেই হজযাত্রা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)