আশির দশকের কথা। বাবার সঙ্গে মাছ বাজারে গিয়েছি ইলিশ কিনব বলে। তখনকার সময়ে ইলিশের মৌসুমে মাছ বিক্রেতাদের ডালায় ভরপুর ইলিশ মাছ থাকত। তাও আবার বড় বড় সাইজের একেকটা ইলিশ। আর পেছনে বাঁশ আর হোগলা পাতার তৈরি ডোলায় বরফের ভেতর সংরক্ষিত থাকত শত শত ইলিশ। তখনকার সময় মানুষের বাসায় এত ফ্রিজ ছিল না। তাই এখনকার মতো প্রয়োজনের বেশি মাছ কেউ কিনত না। বাবা ঘুরে ঘুরে পদ্মার বড় সাইজের একটা ইলিশ দাম করলেন। দোকানি আট টাকা দাম চাইল। বাবা সেটা দরদাম করে ছয় টাকায় কিনলেন।
ছয় টাকার একটা ইলিশ তখন অনায়াসেই দুদিন খাওয়া যেত। অর্ধেক পরিমাণ মাছ রান্নার পর বাকি মাছ পানিতে জাল করে শিকায় তুলে রাখা হতো। সে মাছের পানির ওপরে তেল ভেসে উঠত। রান্নার পর কয়েক বাড়ি দূর থেকেও সে মাছের ঘ্রাণ পাওয়া যেত। সে সময় ধনী-গরিব সবার পাতেই ইলিশ পড়ত। আবার যারা বড় ইলিশ কিনে খেতে পারত না তারা ইলিশের ভাগা কিনে আনত। মাছ বিক্রেতার পেছনে বরফে সংরক্ষিত মাছ বের করে তা কেটে কেটে ভাগা দিয়ে বিক্রি করা হতো সে সময়।
কালের বিবর্তনে ইলিশ মাছ এখন সাধারণ মানুষের প্লেট থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যখনই একটা ইলিশ মাছের টুকরো প্লেটে খেতে নিই তখন একটা কষ্টের স্মৃতি আমাকে ভীষণ নাড়া দেয়। তখন আমি ঢাকার বনশ্রী এলাকায় থাকি। অফিস থেকে বনশ্রী গলির মুখে এসে পৌঁছেছি মাত্র। সেখানে দেখি কিছু লোক ইলিশ মাছ বিক্রি করছে। আমি গাড়ি থেকে নেমে কিছু ইলিশ মাছ দরদাম করছি। আমার পাশেই একটি গার্মেন্টের মেয়ে একটা জাটকা ইলিশ ৩০ টাকা দাম হাকাচ্ছে। বিক্রেতা তাকে ৩৫ বলে দিয়েছে এক দাম। কিন্তু গার্মেন্টকন্যা সে মাছটি ৩৫ টাকায় কিনতে পারেনি। তখনকার সময়ে তাদের সামান্য বেতনে একটা জাটকা ইলিশ খাওয়াও অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিষয়টি অবলোকন করছিলাম।
আরো পড়ুন: কৈলাস মন্দিরের অমীমাংসিত রহস্য
অনেক সময় দেশের সরকার মা ইলিশ রক্ষায় বিশাল বাহিনী গঠন করে থাকেন। আবার জাটকা রক্ষায়ও নানা ধরনের অভিযান লক্ষ করি আমরা। কিন্তু একটা জাটকা যখন গরিব মানুষের প্লেটে ওঠে না তাহলে সে জাটকা বড় হয়ে আর লাভ কী। কারা খায় সে মাছ? ইলিশ মাছ যখন ডিম পাড়ার জন্য সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ছেড়ে আমাদের মিষ্টি পানির নদীতে উজান ঠেলে চলে আসে তখনই মূলত জেলে আর শৌখিন মৎস্য শিকারিরা প্রথমে মা ইলিশ নিধন করেন। তারপর আবার কিছু মাছ যাও আবার ডিম দিতে পারে সে মাছ বড় হওয়ার আগেই আমরা জাটকা অবস্থায় ধরে খেয়ে ফেলি। এভাবেই একদিকে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে দিন দিন। যতটুকু মাছ আমাদের নদীতে পাওয়া যায় সেটুকুও আবার রপ্তানি করা হয় পার্শ্ববর্তী দেশে। তাতেই মধ্যবিত্ত আর গরিব মানুষ তখন আর ইলিশের স্বাদ নিতে পারেন না।
পদ্মা-মেঘনা, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, ইছামতিতেও এক সময় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। সেসব অধিকাংশ নদীর পানিই এখন দূষিত হয়ে পড়েছে। তাতে ইলিশসহ দেশীয় প্রজাতির সব মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন বাকি মেঘনা নদীর পানিও দূষিত হয়ে মাছ ও জলজ প্রাণী চাঁদপুর এবং মতলবের অংশে ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। এ দূষণ একদিন পদ্মায় পৌঁছে যাবে। তখন আমাদের রুপালি ইলিশ শুধু আমরা বইপুস্তক ছাড়া আর কোথায় খুঁজে পাব না। এখনই এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ ৩ হাজার টাকার কমে মেলে না। তাই ইলিশ রক্ষায় আমাদের আগে নদী বাঁচাতে হবে। লোভী জেলে আর মানুষের হাত থেকে মা ইলিশ নিধন ঠেকাতে হবে। এটা ঠেকাতে একা সরকারের পক্ষে সম্ভবপর নয়। মানুষের মধ্যে যদি সচেতনতাবোধ তৈরি করা না যায়, জেলেরা যদি জাটকা বড় হতে না দেয়, নদীপাড়ের লোভী মানুষ যদি রাতের আঁধারে মা ইলিশ ধরা বন্ধ না করেন তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা ইলিশ আর চোখে দেখব না। যেখানে ইলিশ রক্ষায় আমাদের কোস্টগার্ড আর যৌথ বাহিনী সাধারণ ট্রলার নিয়ে অভিযানে নামেন সেখানে জেলেরা মা ইলিশ নিধনের জন্য স্পিডবোট ব্যবহার করে নদীতে নামেন। আবার অনেক এলাকায় জেলেরা পর্যন্ত কোস্টগার্ড আর পুলিশের অভিযানে হামলা চালায়। তাই মা ইলিশ আর জাটকা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়।
বর্ষার মিঠা পানিতে যেভাবে মা ইলিশ উজান ঠেলে আমাদের নদীগুলোতে ধাবিত হয়ে আসতে থাকে সে মাছগুলো যদি সুষ্ঠুভাবে ডিম দিতে পারত এবং তা বড় হওয়ার সুযোগ পেত তাহলে আমাদের নদীগুলো ইলিশে ভরে যেত। তখন একজন গার্মেন্টকর্মীকে একটি জাটকা কিনতে হিমশিম খেতে হতো না।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)