পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার শার্ক বে অঞ্চলের হ্যামেলিন পুলে এক অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক বিস্ময় লুকিয়ে আছে। সমুদ্রের অগভীর স্বচ্ছ জলে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরের মতো কাঠামোগুলো দেখতে সাধারণ মনে হলেও এগুলো আসলে জীবন্ত। এগুলোর নাম স্ট্রোমাটোলাইট এবং এরা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন জীবিত প্রাণীদের মধ্যে একটি।
স্ট্রোমাটোলাইট মূলত সায়ানোব্যাকটেরিয়া নামক এককোষী অণুজীবের তৈরি কলোনি। এই ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়াগুলো স্তরে স্তরে জমা হয়ে পাথরের মতো শক্ত কাঠামো তৈরি করে। প্রতিটি স্তর তৈরি হতে বছরের পর বছর সময় লাগে। হ্যামেলিন পুলের স্ট্রোমাটোলাইটগুলো গম্বুজাকৃতির এবং কিছু কিছু প্রায় এক মিটার উঁচু। এদের বয়স হাজার হাজার বছর। যা সত্যিই মনোমুগ্ধকর তা হলো এই প্রাণীদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে যখন জীবনের সূচনা হয়েছিল, তখন এ ধরনের স্ট্রোমাটোলাইটই ছিল প্রথম দিকের জীবনের রূপ। এরাই প্রথম সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন যোগ করতে শুরু করে। এই অক্সিজেনই পরবর্তী সময়ে জটিল জীবন বিকশিত হওয়ার পথ তৈরি করেছিল। অর্থাৎ, আমরা যে আজ শ্বাস নিচ্ছি, তার পেছনে এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের অবদান রয়েছে।
আরো পড়ুন: যে গ্রামে সূর্যের আলো আসে আয়নায়
হ্যামেলিন পুলে এখনো স্ট্রোমাটোলাইট জীবিত এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ এখানকার পানি অত্যন্ত লবণাক্ত। এই উচ্চ লবণাক্ততার কারণে অন্যান্য প্রাণী, বিশেষ করে শামুক বা অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণী এখানে বাঁচতে পারে না। পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় অন্য প্রাণীরা স্ট্রোমাটোলাইট খেয়ে ফেলে, কিন্তু শার্ক বে’র বিশেষ পরিবেশ এদের সুরক্ষা দেয়। শার্ক বে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত। দর্শনার্থীরা কাঠের বোর্ডওয়াক দিয়ে হেঁটে এই প্রাচীন জীবনের কাছাকাছি যেতে পারেন, তবে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। প্রতিটি স্ট্রোমাটোলাইট অত্যন্ত নাজুক এবং এদের ক্ষতি হলে পুনরুদ্ধার হতে দশকের পর দশক লাগতে পারে।
সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় হ্যামেলিন পুল অসাধারণ সুন্দর দেখায়। স্বচ্ছ ফিরোজা রঙের পানিতে এই প্রাচীন কাঠামোগুলো এক অন্যরকম মায়াবী দৃশ্যের সৃষ্টি করে। মনে হয় যেন সময় এখানে থমকে আছে এবং আমরা পৃথিবীর শৈশবের একটি জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছি। বিজ্ঞানীরা স্ট্রোমাটোলাইট নিয়ে গবেষণা করে পৃথিবীর প্রাচীন জীবন এবং বিবর্তন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। এমনকি মঙ্গল গ্রহে জীবনের অনুসন্ধানেও এদের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ মঙ্গলেও এ ধরনের কাঠামোর চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা হয়। শার্ক বের স্ট্রোমাটোলাইট শুধু একটি প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান নয়, এটি জীবনের ইতিহাসের একটি জীবন্ত জাদুঘর। এখানে দাঁড়ালে মনে হয় যেন কোটি কোটি বছরের ইতিহাস আপনার সামনে মূর্ত হয়ে আছে।
তারেক/
.jpg)