যশোরে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের চোখেমুখে এখন শুধুই দুশ্চিন্তার ছাপ। একদিকে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির ভয়। অন্যদিকে ধান কাটার শ্রমিক সংকট ও বাজারে ধানের নিম্নমুখী দাম। ঝড়বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে জমির ফসল নষ্ট হয়েছে ব্যাপক। সব মিলিয়ে সোনালি ফসল ঘরে তোলা নিয়ে চরম সংশয়ে পড়েছেন জেলার চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর যশোরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ হেক্টর জমি। তবে অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৮৫০ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো চাষ হয়েছে।
মাঠে ধানে পাকলেও সাম্প্রতিক শিলাবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে কেশবপুর উপজেলায় দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, কেশবপুরে ৮৫ হেক্টর জমির বোরো ধান, ৯৫ হেক্টর জমির পাট, ২ হেক্টর জমির সবজি, ১ হেক্টর জমির মরিচ এবং ৩ হেক্টর জমির আম বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
এদিকে, ধান কাটার এই ভরা মৌসুমে মাঠ পর্যায়ে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। মণিরামপুর উপজেলার হারুন উর রশিদ নামে এক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, একসঙ্গে সবার ধান পাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে শ্রমিকের অভাব, অন্যদিকে মজুরি আকাশচুম্বী। দৈনিক ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা দিয়েও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। এই বাড়তি খরচ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে বাজারে ধানের দাম নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি মণ ধান ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কেশবপুর উপজেলার কৃষক সোলাইমান হোসেন বলেন, এক মণ ধান বিক্রি করে দুজন শ্রমিকের মজুরিও দেওয়া যাচ্ছে না। সার, বীজ ও সেচ খরচসহ এক বিঘা জমির ধান ঘরে তুলতে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। চাষ শেষে হিসাব করলে দেখা যায় লাভের ঘর শূন্য।
স্থানীয় ধান ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, খুচরা বাজারে বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে এক মণ ধান কেনাবেচা হচ্ছে। তারা যে দামে বিক্রি করতে পারছেন, সেই অনুযায়ীই কৃষকদের থেকে ধান কিনছেন।
সরকার চলতি মৌসুমে প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও এখনো মাঠপর্যায়ে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হয়নি।
আইয়ুব হোসেন নামে এক চাষি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার ভালো দাম দিলেও আমরা সবাই সেখানে ধান বিক্রি করতে পারি না। নির্দিষ্ট কিছু চাষি এই সুযোগ পান। আমাদের মতো সাধারণ কৃষকদের কম দামেই বাজারে ধান বিক্রি করতে হয়।
এই অঞ্চলের একাধিক চাষি জানান, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে এবং বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়বেন হাজার হাজার কৃষক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে আমাদের বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিছু জায়গায় সামান্য ক্ষতি হলেও আশা করা যাচ্ছে আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অধিকাংশ চাষির ধান ঘরে উঠে যাবে। ইতোমধ্যে গ্রাম অঞ্চলে ৪৫ শতাংশ এবং সদর উপজেলায় ২০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
শ্রমিক সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংকট নিরসনে চাষিরা বর্তমানে কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করছেন। যার মাধ্যমে খেত থেকেই ধান সরাসরি বস্তাবন্দি করে ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে। তবে অনেক কৃষক বিচালির আশায় ধান কাটতে দেরি করেন। যে কারণে অনেক সময় তারা সঠিক সময়ে ধান ঘরে তুলতে পারেন না।
এদিকে, ধানের বর্তমান বাজার দর ও বিপণন পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার জন্য জেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ ও অফিসে গিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।