সংবাদপত্রকে সাহিত্যিক ও শৈল্পিক রূপ দিয়ে জনগণের মনের গহিনে প্রবেশের কলাকৌশল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম খুব ভালো করেই জানতেন বলে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা। তার সম্পাদিত ‘নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’ বা ‘গণবাণী’র মতো পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো সমসাময়িক প্রসঙ্গ ধারণ করেও স্থায়ী সাহিত্যমূল্য লাভ করেছে বলে মনে করেন তারা।
গতকাল শনিবার বিকেলে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘নজরুলের সাংবাদিকতা আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, তিনিই সংবাদপত্রের মাধ্যমেই ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন। তাই সাংবাদিক নজরুল এবং সাহিত্যিক নজরুল—নজরুলচর্চায় অবিচ্ছেদ্য আলোচ্য বিষয়।’
‘কবি নজরুলের সাংবাদিকতা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধে গবেষক ও প্রাবন্ধিক ড. ইসরাইল খান বলেন, ‘কৌতূহলী কেউ যদি পত্র-পত্রিকায় সমকালীন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে রচিত সাংবাদিক নজরুলের লেখার স্বাতন্ত্র্য নিরূপণের প্রয়াস পান, তবে আরও আনন্দদায়ক তথ্য-উপকরণ আবিষ্কার করতে পারবেন।’
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সেমিনারের আলোচনায় অংশ নিয়ে গবেষক মজিদ মাহমুদ বলেন, তিনি সংবাদপত্রে হিন্দু-মুসলমান মিলনের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি ঈদসংখ্যা বা শারদীয় সংখ্যা প্রকাশের মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনিই আমাদের গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ।
নজরুল পুরস্কার-২০২৬ প্রদান
সেমিনারে জাতীয় কবির জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণায় বিশিষ্ট অধ্যাপক রশিদুন্ নবী এবং নজরুলসংগীত-চর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রখ্যাত শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরাকে ‘নজরুল পুরস্কার-২০২৬’ প্রদান করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট এবং ১ লাখ টাকার চেক তুলে দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও মহাপরিচালক।
শিল্পকলায় নজরুল জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন
নারী জাগরণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বার্তা ছড়িয়ে রাজধানীসহ দেশজুড়ে উদ্যাপিত হচ্ছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী। কবিকে স্মরণের এই আয়োজনে দেশের বিশিষ্ট শিল্পী ও বক্তারা নজরুলের দ্রোহ ও মানবিক সত্তাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে শনিবার ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি’ শীর্ষক ৩ দিনব্যাপী উৎসবের দ্বিতীয় দিন ছিল। কবির কালজয়ী সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গান, কবিতা ও নৃত্যে মুখর ছিল জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন। আজ রবিবার সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই উৎসব।
শনিবার বিকেলে নাট্যশালা মিলনায়তনের আলোচনা পর্বে মুখ্য আলোচক হিসেবে নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জাকীর হোসেন নজরুলের জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে শিল্পকলা একাডেমি ও ‘সৃজনী’র কণ্ঠশিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘দাও শৌর্য, দাও ধৈর্য’ এবং ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু’ গান। অনুষ্ঠানে একক সংগীত পরিবেশন করেন শহিদ কবির পলাশ ও অগ্নিতা শিকদার মুগ্ধ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আলাদাভাবে সমবেত কণ্ঠে নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন। আইরিন পারভিনের পরিচালনায় ‘তুমি কি দখিনা পবন’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে ‘নাচঘর’ এবং প্রিয়াংকা সাহার পরিচালনায় ‘তোমার বিনা-তারের গীতি’ গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে ‘আরাধনা’।
দ্বিতীয় পর্বে নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট শিল্পী সুজিত মোস্তফা, সেলিনা রহমান, পুষ্পিতা বণিক, প্রিয়াংকা গোপ, মৃদুলা সমদ্দার এবং ড. নাশিদ কামাল। আবৃত্তি পর্বে কবি নজরুলের কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পাঠ করেন ইকবাল আহমেদ এবং ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ আবৃত্তি করেন ফারহানা তৃণা।