সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে উচ্চকিত করার ধারায় পরিচিত সিলেটের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নগরনাট’।
নিপীড়েনর বিরুদ্ধে পথে নেমে গানমিছিল, কবিতা-কথা ও পথনাটকে একসময় ছিল সংগঠনটির সরব উপস্থিতি।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে স্কুলছাত্রদের ধরপাকড় বন্ধে ‘প্রতিবাদী গানমিছিল’ আয়োজন করেছিল তারা। তবে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে অঘোষিত এক ধরনের ‘বাধার মুখে’ পড়ে দীর্ঘ সময় অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিল সংগঠনটি। অবশেষে পথনাটক ‘রেফারি’ মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে সেই দুই বছরের ‘বাধা’ ঘোচাল নগরনাট।
মঙ্গলবার (২৬ মে) বিকেল সাড়ে ৫টায় সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী সুরমা নদীর তীরের কিন ব্রিজ এলাকার আলী আমজদের ঘড়িঘর প্রাঙ্গণে নারী নিপীড়নবিরোধী এই পথনাটক মঞ্চায়িত হয়।
প্রয়াত নাট্যকার মান্নান হীরা রচিত নাটকটির নির্দেশনা দেন অরূপ বাউল। এতে মুখ্য চরিত্র ‘রেফারি’ অভিনয় করেন উজ্জ্বল চক্রবর্তী। নির্যাতিত নারী চরিত্রে ছিলেন সোনিয়া সুভদ্রা। এছাড়া, শাওন, বিক্রম, দেবর্ষী ও রনি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন।
গান ও প্রতিবাদী স্লোগানে পথনাটক চলাকালে সুরমা নদীতীরের পুরো কিন ব্রিজ এলাকা যেন রূপ নেয় এক প্রতিবাদী প্রাঙ্গণে। নাটক চলাকালে পথচারী সাধারণ মানুষও থমকে দাঁড়ান। সমাজের চেনা নির্মমতার নাট্যরূপ দেখে উপস্থিত অনেকের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। দ্রোহ ও সংহতি জানিয়ে তারা একাত্মতা প্রকাশ করেন এই প্রতিবাদী কর্মসূচির সঙ্গে।
সমাজের প্রতি ‘WHO IS NEXT?’ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে একটি সৌধের নিচে প্রতীকী দুটি লাশ প্রদর্শন করা হয়। ‘রেফারি’ নাটকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ঘটে চলা নারী নির্যাতন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বার্তা তুলে ধরা হয়। সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এখানে ফুটবল খেলার ‘রেফারি’র রূপকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যে রেফারি ফাউল বা অন্যায় দেখেও অনেক সময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে।
নাটকের একপর্যায়ে নির্যাতিতের অভিভাবকের সংলাপ, ‘আমি আর বিচার চাই না!’ তীব্র ক্ষোভ ও আর্তির এক অভিনব প্রতিবাদ হিসেবে ফুটে ওঠে। আলোচিত রামিসা হত্যা ঘটনার পর সমাজের যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তারই প্রতিফলন দেখা যায় এ অংশে।
নগরনাটের সংগঠকেরা জানান, দেশে একের পর এক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার ও প্রতিকার মিলছে না। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের চার বছরের শিশু ফাহিমা ও রাজধানীর শিশুকন্যা রামিসা হত্যার প্রতিবাদে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই আয়োজন।
পথনাটক উপভোগ করতে আসা দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল আশাব্যঞ্জক। তাদের ভাষ্য, এই পথনাটক কেবল বিনোদন নয়; বরং বর্তমান সমাজের এক নির্মম আয়না, যা প্রতিটি নাগরিককে অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাগিদ দেয়।
এসএন/