নাম তার লায়লা বাউল। ফরিদপুর শহরের সবার কাছেই তিনি পরিচিত। তিনি একজন সংসারত্যাগী ভবঘুরে মানুষ। শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, শ্মশানঘাট, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন ও হাটবাজার- যেখানেই লোকসমাগম, সেখানেই তাকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। যেন মানুষ দেখাই তার কাজ।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ফরিদপুরে এক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুলগীতি পরিবেশন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রাতারাতি ভাইরাল হয়েছেন তিনি।
রবিবার (২৪ মে) বিকেলে শহরের ময়েজ মঞ্জিলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ। অনুষ্ঠানে খালি কণ্ঠে নজরুলগীতি পরিবেশন করে রাতারাতি নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হন লায়লা বাউল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক কন্যা ও এক পালক ছেলের জননী লায়লা বাউল সংসারত্যাগী। সন্তানরা বড় হয়ে নিজেদের সংসার করেছেন। কিন্তু লায়লা বাউল আর সংসারে ফেরেননি। কথিত আছে, কোনো ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি হেঁটে প্রায়ই চলে যান আজমীর শরিফে। এভাবে প্রায় ২০ বছর ধরে শহরের বিভিন্ন স্থানে খালি পায়ে ঘুরে ঘুরে লোকগানসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন নামকরা শিল্পীর গান গেয়ে চলেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানের আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। কয়েকটি নজরুলগীতি পরিবেশন করে তিনি উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করেন। ফরিদপুর শহরবাসী তার খালি কণ্ঠের গানের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত। তবে কে জানত, তার গাওয়া গান এক রাতের ব্যবধানে দেশজুড়ে ভাইরাল হয়ে যাবে। নেটিজেনরা তার গানে মুগ্ধ।
অনেকেই ভারতের রানু মণ্ডলের মতো লায়লা বাউলও ভাইরাল হয়ে যাবেন বলে মন্তব্য করছেন।
অনুষ্ঠানে দেখা যায়, পরনে জীর্ণ শাড়ি, খালি পা। তিনি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মনের আনন্দে সাবলীলভাবে গাইছেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘নয়নভরা জল গো তোমার...’। তার গায়কি ও কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছেন দেশের নামিদামি শিল্পী ও সুধীজনরা। অনেকে তার ভিডিও শেয়ার করে মুগ্ধতার কথা লিখছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে তাকে শহরে এভাবেই দেখছি। তিনি একজন সংসারত্যাগী ভবঘুরে নারী। গতকাল তাকে হঠাৎ করেই মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু তার খালি কণ্ঠের গান যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। লায়লা বাউল খুবই ভালো মনের মানুষ। শহরের বিভিন্ন স্থানে দিন-রাত ঘুরে বেড়ান, গান গাইেন, কিন্তু কারও কোনো ক্ষতি করেন না। তার একটি পালক ছেলে আছে, সে খোঁজখবর রাখে। লায়লা বাউল শহরের অলিগলি ছাড়াও শ্মশানঘাট ও রেলস্টেশনে বেশি সময় কাটান। বিশেষ করে তার কণ্ঠে লোকগান বেশি শোনা যায়। লোকসংগীতের পাশাপাশি প্রায় সব ধরনের গানই গাইতে পারেন তিনি।’
ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোফিজ ইমাম মিলন বলেন, ‘আরও ২০ বছর আগে লায়লার গান শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। শিল্পকলা একাডেমিতে যেখানে গানের চর্চা হতো, সেখানে তাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখতাম।’
লায়লা বাউলের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘‘লায়লাকে ঘুরে বেড়াতে দেখে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলতেন- ‘আমি মানুষ দেখি। দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ! এত মানুষ, কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে।’’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। তার গুণ ও অবদান আমরা যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারি না। তার বিদ্রোহী কবিতা থেকেই ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনের অনেক প্রেরণা এসেছে। আমরা নজরুলকে বিদ্রোহী কবি হিসেবে জানি, তবে তিনি ছিলেন সাম্যের কবি ও প্রেমের কবি।
লায়লার খালি গলায় সুরেলা গান শুনে অন্যদের মতো তিনিও মুগ্ধ বলে জানান।
অনুষ্ঠানে সুর ও সংগীত পরিবেশন করেন মো. আলাউদ্দীন, বর্ণা ঘোষ, শিপ্রা গোস্বামী ও লায়লা বাউল।
কবিতা আবৃত্তি করেন শামিম আরা বেগম, নিলয় বিশ্বাস ও রজ্জাক রেজা।
অনুষ্ঠানে অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করা হয় এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন খান পলাশ, নাট্যকার-শিক্ষক ড. অনুপম হায়াৎ, প্রবীণ সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ বদিউজ্জামান চৌধুরী, ফরিদপুর ফাউন্ডেশনের গোলাম মহিউদ্দিন মুন্না ও জেলা জিয়ামঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সমাজসেবক প্রফেসর এম এ সামাদ।
অমিয়/