মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পূর্ণ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই)। ঘুরে ফিরে আবারও স্মরণকালের সেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াল স্মৃতি ফিরে আসে কান্না, আর্তনাদ আর আহাজারি হয়ে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কারও ভাই, কারও সন্তান, কারও বন্ধু-স্বজন কিংবা প্রিয় ছাত্রদের অকালে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার দৃশ্যপট।
স্বজনের বুকফাটা আহাজারিতে এখনো ভারী হয় আবুতোরাবের আকাশ বাতাস। এখনো গভীর রাতে আসে কান্নার রোল। স্মৃতি বলতে শুধুই ছবির ফ্রেম। নাড়িছেঁড়া ধন ছেলেকে হারিয়ে মা-বাবা সেই ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে আহাজারি করেন। আবার কখনো হয়ে যান নির্বাক।
ট্র্যাজেডিতে নিহত রায়হান উদ্দিনের মা কোহিনুর বেগম বলেন, ‘আমার এখনো বিশ্বাস হয় না ছেলে নেই। এইতো সেদিন রায়হান খেলা দেখতে বের হয়েছিল, সে ফিরে আসবে।’
প্রতি বছর ১১ জুলাই এলে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন নিহতদের পরিবার, স্বজন, স্কুলশিক্ষকরা তথা সমগ্র মিরসরাই। হারানো সন্তানদের ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে বাবা-মায়েদের কাঁদতে দেখা যায় প্রতি বছরই। কারও বা চোখের পানি ঝরতে ঝরতে এখন হয়ে গেছেন মরা পাথর। চাইলেও কাঁদতে পারেন না এখন তারা।
ট্র্যাজেডি থেকে বেঁচে ফেরা তৎকালীন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আমরা খেলায় জেতার খুশিতে এতটাই বিমোহিত ছিলাম যে কখন আমরা রাস্তার পাশে খাদের পানিতে পড়ে ট্রাকচাপা পড়েছি কিছুই বলতে পারব না। শুধু দেখছিলাম চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি হয়তো মারা যাচ্ছি। বের হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে হাত-পা ছুঁড়তে থাকি। আমার মতো অন্যরাও চেষ্টা করেছে। একটা সময় আমি বের হতে পারি। অন্যরা পানির ভেতর থেকে টানাটানি করে আমার হাত-পা নখ দিয়ে কেটে ফেলেছিল। যখন আমি পানি থেকে উঠে ওপরে আসি, তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমি বেঁচে আছি। আমার হাত-পা নিথর হয়ে যায়। সেই মুহূর্তের পর আর কিছুই আমার মনে নেই। আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এরপরই আমি অসুস্থ হয়ে যাই। বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরি। আমি বেঁচে ফিরেছি, অন্যরা মারা গেছে এটা মনে হতেই আমার খুব কষ্ট হয়।’
জানা যায়, ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা সদরের স্টেডিয়াম থেকে বঙ্গবন্ধু- বঙ্গমাতা ফুটবল খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে বড়তাকিয়া আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় চালকের অসতর্কতায় প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থীকে বহনকারী একটি মিনি ট্রাক উল্টে পাশের ডোবায় পড়ে যায়। যেখানে ৪২ জন শিক্ষার্থীসহ ৪৫টি তাজা প্রাণ ঝরে যায়। লাশের মিছিলে ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের পর গ্রাম। শোকের জনপদে পরিণত হয়েছিল মায়ানী, আবুতোরাব, মঘাদিয়াসহ পার্শ্ববর্তী সাতটি গ্রাম। আজও সেই ডোবার পাশে এলেই গা শিউরে ওঠে স্বজন সহপাঠী কিংবা পথচারীদের। তবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী নিহত হওয়া আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ফটকে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ আর দুর্ঘটনাস্থলে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’।
আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘নিহতদের স্মরণে স্কুল প্রাঙ্গণে ছোট পরিসরে স্মরণসভার আয়োজন হয়েছে। এ ছাড়া স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, নিহত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আবুতোরাব স্কুলপ্রাঙ্গণে ‘আবেগ’ ও দুর্ঘটনাস্থল ‘অন্তিমে’ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। এ ছাড়া নিহত স্কুলশিক্ষার্থীদের স্মরণে স্থানীয় মসজিদ, মন্দির, গির্জায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।’
মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে উপজেলার আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৪ জন, আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারজন, আবুতোরাব ফাজিল মাদ্রাসার দুইজন, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের দুইজন শিক্ষার্থী সেদিন নিহত হন। এ ছাড়া এক অভিভাবক দুজন ফুটবলপ্রেমী কিশোরসহ ৪৫ জনের মৃত্যু হয়।