রমজান মাস এলেই রাজশাহীর ইফতার বাজারে একটি খাবারের চাহিদা বাড়ে। বছরের পর বছর ধরে খাবারটি তার স্বাদ ও ঐতিহ্য দাপটের সঙ্গে ধরে রেখেছে। এটি হলো নগরীর গণকপাড়া মোড়ের রহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁর ‘দিল্লির শাহী ফিরনি’। ৭৬ বছর ধরে একই স্বাদে তৈরি এই ফিরনি রাজশাহীর ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ১৯৫০ সালে ৪ আনা (২৫ পয়সা) দামে মাটির ছোট বাটিতে যে ফিরনির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। যদিও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে দাম, বদলেছে বাজার; তবে স্বাদ ও ঐতিহ্যে কোনো ছেদ পড়েনি। বর্তমানে প্রতি বাটি (১০০ গ্রাম) ফিরনির দাম ৩৫ টাকা। রমজান মাসে ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত সারা রাতই চলে এর বেচাকেনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর আনিছুর রহমান খান নামে এক ব্যক্তি পরিবারসহ রাজশাহীতে আসেন। ১৯৫০ সালে তিনি নগরীর গণকপাড়া মোড়ে রহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকালে হোটেলের কারিগররা ছিলেন ভারতীয়। তাদের হাত ধরেই ‘দিল্লির শাহী ফিরনি’ রাজশাহীতে প্রচলিত হয়। শুরু থেকেই প্রতিটি বাটিতে ১০০ গ্রাম করে ফিরনি পরিবেশন করা হয়।
রাজশাহী রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি ও রহমানিয়া হোটেলের স্বত্বাধিকারী রিয়াজ আহমেদ খান জানান, প্রতিষ্ঠাকালে এক বাটি ফিরনির দাম ছিল ৪ আনা। এখন ৩৫ টাকা হলেও বর্তমান বাজারদরের তুলনায় তা খুবই কম। তিনি বলেন, ‘দাদার মৃত্যুর পর আমার বাবা আব্দুল বারি খান ব্যবসার হাল ধরেন। বাবার মৃত্যুর পর বর্তমানে আমি ব্যবসাটি পরিচালনা করছি।’
প্রায় ৫০ বছর আগে মাত্র ১ টাকা ৪ পয়সা বেতনে রহমানিয়ায় ফিরনি তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ শুরু করেন মো. চাঁন। আজও তিনি সেই ঐতিহ্যের সাক্ষী। তার ভাষায়, দুধ, পোলাও চালের গুঁড়া, কিশমিশ, চেরি ফল, চিনি ও বিশেষ মসলার সংমিশ্রণে তৈরি হয় এই ফিরনি। পরে মাটির পাত্রে জমিয়ে বিক্রি করা হয়।
যুগের পর যুগ ধরে একই রেসিপি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘আগে সারা বছরই ফিরনি পাওয়া যেত। বর্তমানে রমজান মাস ও বিশেষ অর্ডারে এটি প্রস্তুত করা হয়। চলতি রমজানে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৪০০ বাটি ফিরনি বিক্রি হচ্ছে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসে, বিক্রিও তত বাড়ে।’
নগরীর অলোকার মোড় এলাকা থেকে ইফতার কিনতে আসা রাসেল মুস্তাফিজ বলেন, ‘প্রায় এক যুগ ধরে রোজায় ইফতারের সঙ্গে এই ফিরনি কিনছি। ঐতিহ্য আর স্বাদের কারণে এটি ছাড়া ইফতার পূর্ণতা পায় না।’ তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও ফিরনির দাম ছিল ১৫ টাকা। এখন ৩৫ টাকা হলেও স্বাদের জন্য কেনা বন্ধ করেনি।’
নগরীর ষষ্টিতলা এলাকার ষাটোর্ধ্ব সুফিয়া বেগম জানান, প্রায় ২৫ বছর ধরে তার পরিবারের ইফতার তালিকায় এই ফিরনি রয়েছে। অন্যান্য খাবারের সঙ্গে এই সুস্বাদু ফিরনি না থাকলে ইফতার অসম্পূর্ণ মনে হয়।
রমজান মাসে রহমানিয়া হোটেলের প্রধান আকর্ষণ শাহী ফিরনি হলেও ইফতারের আয়োজনও বেশ সমৃদ্ধ। হোটেলের সেলসম্যান মো. কালু জানান, প্রতিদিনের ইফতার প্যাকেটে থাকে বুট, খেজুর, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, জিলাপি, সমুচা, কলা, শসা, মুড়ি, কাঁচা বুট ও নিমকপাড়া। প্রতি প্যাকেটের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
এ ছাড়া খাসির তেহারি (হাফ প্লেট) ৮০ টাকা, চিকেন বিরিয়ানি (হাফ প্লেট) ১০০ টাকা, কাচ্চি ১২০ টাকা, শিক কাবাব ৫০ টাকা, কাঠি কাবাব ৩০ টাকা, চিকেন কাবাব ও টিক্কা ৫০ টাকা, চিকেন সাসলিক ৫০ টাকা, ক্রিসপি চিকেন ৮০ টাকা, গ্রিল চিকেন ৮০ থেকে ৩২০ টাকা এবং শামি কাবাব ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাসির কিমার সমুচা বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকা দরে।