রাজশাহীর তানোর ও মোহনপুর উপজেলায় যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিলকুমারীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া শিব নদীর ওপর নির্মিত সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে বেহাল পড়ে আছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঝুঁকি নিয়ে এই পথে চলাচল করেন। ছোট-বড় গর্ত, উঠে যাওয়া ইট, ভাঙা অংশ, কাদাপানি আর ধসে পড়া রাস্তার কারণে এলাকাবাসীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
স্থানীয়রা জানান, এই সেতু একসময় শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই ছিল না, ছিল দুই উপজেলার মানুষের প্রাণকেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা সেতুটি দেখতে প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসতেন।
বিশেষ করে বিকেলের দিকে সেতুর ওপর মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ যেমন চলাচলে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন, তেমনি কমে গেছে দর্শনার্থীর সংখ্যাও।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর দুই পাশের কয়েক শ’ মিটার এলাকায় সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও ইট উঠে গিয়ে কাঁচা মাটির স্তর বের হয়ে এসেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেই অংশ কাদায় পরিণত হয়। ফলে অটোরিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রায়ই যানবাহন আটকে যাচ্ছে কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাস্তার এমন দুরবস্থার কারণে এই সড়কে যান চলাচল কমে গেছে। ভাঙা রাস্তার কারণে যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যান চালকদের আয়ের একটি বড় অংশ গাড়ি মেরামতের পেছনে খরচ করতে হচ্ছে। তারা চাইছেন দ্রুত সময়ের মধ্যে রাস্তাটির সংস্কার করা হোক। এমনকি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ভাঙা রাস্তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রকল্প তৈরি করে ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সংস্কার শুরু হবে।
স্থানীয় ইজিবাইকচালক আফজাল হোসেন বলেন, ‘এই রাস্তায় গাড়ি চালানো মানে প্রতি মুহূর্ত জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে যায়, তখন গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায়ই গাড়ির চাকা গর্তে আটকে যায়। এতে যাত্রীদের কাছ থেকেও অভিযোগ শুনতে হয়। রাস্তাটির কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেরামতে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। আয় যা হয়, তার বড় একটা অংশ গাড়ি ঠিক করতেই চলে যায়।’
মোটরসাইকেল চালক সোহানুর ইসলাম বলেন, ‘রাতে এই সড়কে চলাচল করা খুবই ভয়ংকর। কোথায় গর্ত, কোথায় রাস্তা ভাঙা–তা বোঝার উপায় থাকে না। সামান্য অসাবধান হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক সময় হঠাৎ ব্রেক করতে গিয়ে মোটরসাইকেল পিছলে পড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় চলাচল একেবারেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
শুধু সড়ক নয়, সেতুর বিভিন্ন অংশেও ক্ষয়ের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। কয়েকটি স্থানে ঢালাই উঠে গেছে এবং রেলিংয়ের কিছু অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সেতুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় চা দোকানি সোহেল রানা বলেন, ‘আগে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসত। এখন রাস্তার কারণে মানুষ কমে গেছে। বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কম।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পানির চাপে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে দায়সারা সংস্কার করা হলেও কয়েক মাস যেতে না যেতেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার অভাবেই বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তার নিচের মাটি দুর্বল হওয়ায় ভারী যানবাহনের চাপ সহ্য করতে পারছে না। ফলে মাটি সরে গিয়ে রাস্তা ধসে পড়ছে।
আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প প্রস্তাবনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত টেকসই সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।’