নাড়ির টানে দীর্ঘ ৩৮ বছর পর বাড়ি ফিরেছেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী গ্রামের ৬৬ বছর বয়সী জাবেদ আলী। অজানা কোনো এক অভিমানে নিরুদ্দেশ হয়ে যান তিনি। দীর্ঘ তিন যুগ পার হয়ে গেলেও ঘরে ফেরেননি কখনো।
পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন তিনি মারা গেছেন। সেই মোতাবেক চলছিল সবকিছু। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় গত সোমবার যখন হঠাৎ জাবেদ আলী হাজির হন নিজ পৈতৃক ভিটায়। তাকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা। কেউ কেউ ছোটবেলায় নাম শুনলেও কখনো চোখে দেখেননি। তাই জাবেদ আলীর ফিরে আসায় তাকে দেখতে ভিড় জমান অনেকেই। তবে স্বামী জাবেদ আলীর ফিরে আসায় খুশির চেয়ে উল্টো চাপা কষ্ট ও অভিমান বেড়েছে প্রথম স্ত্রী রুশিয়া খাতুনের। স্বামীর রেখে যাওয়া ৪ বছরের সন্তান জাহাঙ্গীরকে নিয়ে খুবই কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হয়েছে তাকে। তাই তিনি স্বামীর কাছে জবাবদিহি চেয়েছেন।
জাবেদ আলীর প্রথম স্ত্রী রুশিয়া খাতুন বলেন, আজ থেকে ৩৮ বছর আগে চার বছর বয়সী ছেলে জাহাঙ্গীর ও আমাকে বাড়িতে রেখে তিনি চলে যান। অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ মেলেনি। স্বামী হারিয়ে যাওয়ার পর অনেক কষ্ট করে ছেলেকে নিয়ে চলতে হয়েছে। না খেয়ে অনেকদিন কেটেছে আমাদের। দীর্ঘদিন পর হঠাৎ স্বামী ফিরে এসেছে। তার কাছে আমার চাওয়া দীর্ঘ ৩৮ বছরের দুঃখ-কষ্ট পুষিয়ে দেওয়া। তবেই আমি তাকে গ্রহণ করব।
প্রথম স্ত্রী রুশিয়া খাতুন গ্রহণ না করায় জাবেদ আলী আশ্রয় নিয়েছেন বড় ভাই আবেদ আলীর বাড়িতে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৮৮ সালে নিরুদ্দেশ হওয়া জাবেদ আলী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছেন। মানিকগঞ্জে আরও একটি বিয়েও করেছিলেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী মারা গেলেও তাদের একটি মেয়ে রয়েছে। তার বয়স এখন ১০ বছরের কিছু বেশি। নিজের পৈতৃক ভিটায়ই তিনি ফিরে এসেছেন এবং তার সেই মেয়েকেও নিয়ে আসতে চান।
জাবেদ আলী বলেন, ‘কেউ কি সহজে ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে চায়। আমি কেন গিয়েছিলাম সেই প্রশ্নটা করবেন না আমাকে। দুঃখ-কষ্ট ছাড়া কেউ ঘর ছাড়ে না। দীর্ঘ ৩৮ বছরের মধ্যে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছি কিন্তু সময় ও সামর্থ্য হয়নি আমার। অবশেষে শেষ বয়সে এসে নিজের বাপের বাড়িতে ফিরেছি। বাকি জীবন এখানেই কাটাতে চাই’।
জাবেদ আলী আরও বলেন, ‘আমি ফিরে আসায় বড় ভাই আবেদ আলীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা ব্যাপক খুশি হয়েছে। আমার একটি ছেলে রয়েছে, সে এখন বিদেশ থাকে। ছেলে মোবাইলে জানিয়েছে আমি যেন এখন থেকে এখানেই থাকি। তবে আমার প্রথম স্ত্রী রুশিয়া খাতুনের সঙ্গে আমার এখন পর্যন্ত কোনো কথা হয়নি’।
জাবেদের বড় ভাই আবেদ আলী বলেন, আমার ভাই হঠাৎই হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর তাকে পাইনি। ৩৮ বছর পর আমার ভাই আমাদের বুকে ফিরে এসেছে। আমি আনন্দে আত্মহারা। ভাই ফিরে আসার আনন্দে আমার চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছে।
জাবেদ আলী মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার বামন্দী ইউনিয়নের বামন্দী গ্রামের পুলিশক্যাম্প পাড়ার মৃত তোফাজ্জল মণ্ডলের ছেলে।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হুদা বলেন, আমাদের প্রতিবেশী জাবেদ আলী ভাই যুবক বয়সে স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তার নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথিত গল্প এলাকায় প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন যাত্রাপালার নায়িকার প্রেমে পড়ে তিনি ঘর ছেড়েছিলেন। কিন্তু তিনি কোন্ অভিমানে বাড়ি থেকে চলে যান সেটি সঠিকভাবে কেউ জানে না। তবে দীর্ঘদিন পর তিনি ফিরে আসায় এলাকায় আনন্দের জোয়ার বইছে।
বামন্দী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শাহ আলম বলেন, যতদূর শুনেছি আমি দায়িত্ব পাওয়ার আগে জাবেদ আলীর মৃত্যু সনদ তোলা হয়েছে। জায়গা-জমি বিক্রির ক্ষেত্রে হয়তোবা তার মৃত্যুর সনদটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া হতে পারে। তবে নথিপত্র দেখে বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে হবে। যেহেতু তিনি বেঁচে আছেন, তাই সবকিছু এখন নিয়মমাফিক হবে বলে আমার মনে হয়।