‘প্রায় তিন কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে শুনসান নীরবতা। এ যেন বহু বছরের পরিত্যক্ত জনপদ। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বিটুমিন উঠে বড় গর্ত আর খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব গর্তে পানি জমে চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও বিটুমিন, ইটের খোয়া উঠে এমন অবস্থা হয়েছে, সেখানে রাস্তার কোনো চিহ্ন নেই। প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বাড়ছে যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি। ফলে পারতপক্ষে স্থানীয়রা যাতায়াতের ক্ষেত্রে সড়কটি এড়িয়ে চলেন। বিগত দিনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সড়কটি মেরামতের আশ্বাস দিলেও প্রায় দেড় যুগ ধরে ভোগান্তিতে রয়েছে রূপসাপাড়ের মানুষ।’
হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন খুলনার রূপসার বাগমারা গ্রামের স্কুলশিক্ষক মোহসিন আলী ফরাজী। তিনি বলেন, ‘এই সড়ক নিয়ে আমরা বছরের পর বছর খুবই দুর্ভোগে আছি। এলাকার কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সড়কের খানাখন্দে পড়ে মোটরসাইকেল, মোটরচালিত ভ্যানগাড়ি, ইজিবাইক, পিকআপ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পূর্ব রূপসা বাসস্ট্যান্ড থেকে খানজাহান আলী সেতু পর্যন্ত সড়কটির প্রায় অধিকাংশ স্থানেই পিচ উঠে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন কোনো সংস্কারকাজ না হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ের বৃষ্টিতে বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, সড়কটির পূর্ব রূপসা প্রান্তে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের সমাধিস্থল রয়েছে, তার নামেই সড়কটি বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়ক নামকরণ করা হয়। এ ছাড়া দুই পাশে প্রায় ১৮টি হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানা, বহুসংখ্যক বরফকলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া নদীর তীরে বিশাল জায়গাজুড়ে বেশ কিছু বালুর স্তূপ রয়েছে। মূলত প্রতিদিন ভারী যানবাহনের চাপ ও রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সড়কের এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সড়কটি মেরামতের দাবি জানানো হলেও কর্মকর্তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি। ফলে যাতায়াতের ভোগান্তিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধস নেমেছে। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনে বিলম্ব ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। সেই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নূর হোসেন বলেন, ‘কষ্টের শেষ নাই আমাগে। কেউ অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে এ পথে যাতায়াত করার মতো উপায় নেই। সড়কটি দীর্ঘদিনে সংস্কার না করায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। একসময় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এ সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করত। এখন রাত তো দূরের কথা, দিনের আলোতে মানুষ হেঁটে চলাচল করতে পারে না।’
নৈহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইলিয়াস হোসেন বলেন, সড়কের পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ড্রেন নেই। বৃষ্টি হলেই রাস্তা তলিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে গাড়ি চলাচলের ফলে রাস্তাটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ্জামান বলেন, বছরের পর বছর ধরে রূপসার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কে খানাখন্দে চলাচলে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয়রা। সড়ক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন জানানো হলেও তারা কর্ণপাত করেনি। কখনো এটিকে বেড়িবাঁধ সড়ক আবার কখনো উপজেলা পর্যায়ের গ্রামীণ সড়ক দাবি করে বড় অঙ্কের বাজেট পাওয়া যাবে না বলে সংস্কার করা হয়নি।
নিরাপদ সড়ক চাই খুলনার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান জানান, সড়কের কিছু কিছু স্থানে খানাখন্দে ইটের অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই। বহু আগেই সড়কের বিটুমিন উঠে গেছে। স্থানীয়রা সড়ক সংস্কারের দাবিতে কয়েক দফা মানববন্ধনসহ স্মারকলিপি প্রদান করলেও রাস্তাটি সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে চলমান বর্ষা মৌসুমে খানাখন্দে এ পথ দিয়ে যাতায়াত বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে।
রূপসা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী নাজমুল হুদা বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার স্টিমেট তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলে প্রায় ৩ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করা যাবে। যেসব জায়গায় সড়কে বেশি সমস্যা সেখানে আরসিসি ঢালাই দিয়ে কাজ করা হবে।