রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র গ্যাসসংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখো গ্রাহক। গত চার দিন ধরে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও বাসাবাড়িতে গ্যাসসংকট চলমান রয়েছে। একদিকে গাড়িচালকদের কর্মজীবনে নেমে এসেছে বিপর্যয়, অন্যদিকে বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও ভোররাতে ঘণ্টাখানেকের জন্য গ্যাস মিললেও চাপ এতই কম যে রান্না শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)-এ কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ অনেক কমে গেছে।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আদাবর, ধানমন্ডি, উত্তরা, বাড্ডা, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, দিনের বেলায় চুলায় গ্যাস থাকে না বললেই চলে। অনেক এলাকায় পানি ফুটাতেও দীর্ঘ সময় লাগছে, আবার কোথাও সারা দিন গ্যাসের কোনো অস্তিত্বই নেই। রাত ২টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও সেই সময় পুরো রান্না শেষ করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে গভীর রাতে কিংবা ভোরে উঠে রান্না করছেন। আবার কিছু এলাকায় একেবারেই গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে মাটির চুলায় রান্না করতে দেখা গেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, অফিসগামী সদস্য ও স্কুল-কলেজপড়ুয়া সন্তানদের জন্য প্রতিদিন খাবার প্রস্তুত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। এতে সংসারের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। কাঁঠালবাগানের এক গৃহিণী বলেন, প্রতিদিন ভোর ৩-৪টার দিকে উঠে রান্না করতে হচ্ছে। কখন গ্যাস আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এভাবে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর গ্রিনরোডের ক্রিসেন্ট রোডের বাসিন্দা রোকসানা আক্তার রুমা খবরের কাগজকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসসংকটে ভুগছি। বাসায় ঠিকমতো রান্না করতেও পারি না। ভোররাতে মিটমিট করা একটু গ্যাস এলেও ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই আবার চলে যায়। লাইনে গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে রান্নার কাজ সারছি অথচ প্রতি মাসেই বাধ্যতামূলক গ্যাস বিল দিতে হচ্ছে। এভাবেই বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে দুপুরে কাঁঠালবাগান ঢাল এলাকার একটি বস্তিবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রান্নার জন্য লাইনের ছয়টি গ্যাসের চুলা আছে অথচ একটিতেও গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে বাসিন্দারা মাটির চুলায় রান্না সারছেন। বর্তমানে এমন চিত্র রাজধানীর প্রায় সব এলাকাতেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রাজধানী নয়, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরেও একই চিত্র। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে আধা ঘণ্টা চুলা জ্বালিয়েও এক রান্না শেষ করা যাচ্ছে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি ও মানসিক চাপ।
গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসাতেও। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করতে হয়, এমন অনেক খাবার সাময়িকভাবে মেনু থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর ধানমন্ডির ক্যাফে আল বারাকার কর্মচারীরা খবরের কাগজকে জানান, গ্যাসসংকটের কারণে কয়েকটি জনপ্রিয় খাবার আপাতত পরিবেশন করা যাচ্ছে না।
রাজধানীর গ্যাস পাম্পগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজি, প্রাইভেট কার, রাইড শেয়ারিং ও রেন্ট-এ-কার চালকরা। রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না গ্যাস। কোথাও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ, আবার কোথাও চাপ এতই কম যে একটি গাড়িতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস ভর্তি করা যাচ্ছে না।
রামপুরা ও মেরুল বাড্ডার সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে, শত শত চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে আশপাশের সড়কেও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বাড্ডার জামান স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষারত চালক সোলেমান জানান, সারা দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও আয় হচ্ছে না, কিন্তু মালিকের নির্ধারিত জমার টাকা ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
এদিকে গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটি দ্রুত মেরামতের জন্য সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা যৌথভাবে মেরামত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং জ্বালানি বিভাগ সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অচিরেই জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
তবে কবে বা কখন গ্যাসসংকটের সমাধান হবে সে বিষয়ে তিনি কিছুই বলেননি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছে, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মেরামতকাজ ঠিক কবে শেষ হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কাজ চললেও পুরোপুরি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।