যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ আবারও নতুন করে শুরু হয়েছে। কয়েক মাস তুলনামূলক নীরব থাকার পর আবারও শুল্ক আরোপের পথে হাঁটছে তার প্রশাসন। এবারের পদক্ষেপ শুধু পণ্যের দাম নয়, বিশ্বজুড়ে সরবরাহব্যবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্কেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সিএনএনের এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বিস্তৃত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার পর মার্কিন প্রশাসন আবারও নতুন কৌশলে এগোচ্ছে। গত শুক্রবার থেকে ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বাতিল হয়ে যাওয়া আগের শুল্কের কাছাকাছি হওয়ায় এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি তৈরি করবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ট্রাম্প এখানেই থামবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। তার আগের পদক্ষেপ ও সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলো বলছে, শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা এখনও তার বাণিজ্যনীতির বড় অংশ।
হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশের পণ্য আমদানির ওপর শুল্ক কর্মসূচি বাড়িয়েছেন। শুরুতে কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের পণ্যের ওপর ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপ করেন তিনি। এর পর প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ‘পারস্পরিক শুল্ক’ আরোপের ঘোষণা দেন।
সুপ্রিম কোর্ট ওই শুল্কের একটি অংশকে অবৈধ বললেও ট্রাম্প থামেননি। বরং এর পর তিনি আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
সিএনএন বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন আগের শুল্ক কাঠামো নতুন আইনি ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। গত শুক্রবার কার্যকর হওয়া শুল্ক এরই অংশ। এগুলো মূলত জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ নিয়ে করা তদন্তের ভিত্তিতে আরোপ করা হয়েছে।
এর আগে ব্রাজিলের কিছু পণ্যের ওপরও নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। ভিন্ন একটি আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ব্রাজিলের কিছু নীতি মার্কিন বাণিজ্যের ক্ষতি করছে। তবে এসব শুল্ক আদালতে টিকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে আগের শুল্ক মামলায় জয় পাওয়া লিবার্টি জাস্টিস সেন্টার শুক্রবার নতুন শুল্কের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে।
সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও লিটিগেশন বিভাগের পরিচালক জেফরি শোয়াব বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন তৃতীয়বারের মতো এমন একটি বৈশ্বিক শুল্কনীতি চালুর চেষ্টা করছে, যা আইনে নির্ধারিত সীমার বাইরে।’
তবে জরুরি ক্ষমতার মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এসব আইনে নেই। এ কারণে আরেকটি আইনি পথ নিয়ে নজর রাখছেন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা। সেটি হলো ১৯৩০ সালের স্মুট-হাওলি ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ ধারা।
এর আগে এই ধারা ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ করা হয়নি। কিন্তু চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প এই ধারার কথা উল্লেখ করে কানাডার কিছু পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তার অভিযোগ, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প শুল্ককে শুধু বাণিজ্যনীতির অংশ হিসেবে নয়, আলোচনায় চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছেন। বাণিজ্য বিরোধ মেটানো থেকে শুরু করে বড় রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব তৈরির ক্ষেত্রেও তিনি শুল্ককে কাজে লাগাচ্ছেন।
পিকক ট্যারিফ কনসাল্টিংয়ের প্রধান কাইল পিকক বলেন, ‘আমার অনেক কানাডীয় গ্রাহক আশঙ্কা করছেন, নতুন শুল্ক আরও বড় আকার নিতে পারে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগে পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে দিনরাত কাজ করছে।’
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধেও নতুন তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তার অভিযোগ, ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান– গুগল, অ্যাপল, মেটা ও অ্যামাজনের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এই তদন্তের ফলেও নতুন শুল্ক আসতে পারে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্য অংশীদার ১৬টি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে আরেকটি তদন্ত চলছে। এসব তদন্তের ফল থেকে আসা শুল্কও আগের শুল্কের সঙ্গে যোগ হতে পারে।
ফিচ রেটিংসের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক অর্থনীতির প্রধান ওলু সোনোলা বলেন, ‘শুল্ক আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ের দিকে গেলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়বে। এতে প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে।’
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, আগামী নভেম্বরের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কারণে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধি এড়িয়ে চলতে পারে। তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদের একটি বিষয় স্পষ্ট– শুল্ক নিয়ে লড়াই যেকোনো সময় আরও বড় আকার নিতে পারে এবং দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে পারে। সূত্র: সিএনএন