মরুভূমির ‘জাহাজ’ হিসেবে পরিচিত উটও আর তীব্র গরম সহ্য করতে পারছে না। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা, দীর্ঘ খরা ও পানির সংকটে উটের মৃত্যু বাড়ছে। প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্য, প্রজনন ও দুধ উৎপাদনেও। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
উত্তর-পূর্ব ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ ও শুষ্ক এলাকাগুলোর একটি। এখানকার যাযাবররা বহু বছর ধরে লবণ পরিবহনে উটের কাফেলা ব্যবহার করে আসছেন। আফারের সেমেরা এলাকার উটপালক আলী উমের বিবিসিকে বলেন, তীব্র গরমে তার উটগুলো ভয়াবহ কষ্ট পাচ্ছে। তাদের পায়ে ফোসকা পড়ছে। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। গরম বালু শরীরের চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে। তার প্রায় ৫০০টি উটের মধ্যে গত এক মাসেই তীব্র গরমে আটটি উটের মৃত্যু হয়েছে।
শুধু আলী উমের নন, একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন অন্য উটপালকরাও। বিজ্ঞানী, প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন গবেষণাও একই চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরমে উটের শরীরে তাপজনিত চাপ বাড়ছে। এতে ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও বিভিন্ন সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে।
বিশ্বের এক কুঁজবিশিষ্ট ড্রোমেডারি উটের প্রায় ৮০ শতাংশই উত্তর আফ্রিকা ও আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে রয়েছে। তবে ২০২৫ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ ইথিওপিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা উটের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও প্রজননের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেশী সোমালিয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, খরার কারণে দেশটির প্রায় ৪৬ শতাংশ পরিবার তাদের পালন করা উট হারিয়েছে। প্রায় ছয় হাজার যাযাবর পরিবারের ওপর চালানো ওই গবেষণায় দেখা যায়, উত্তরাঞ্চলের সুল এলাকায় উটের মৃত্যুর হার প্রায় ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
বায়ুমণ্ডলবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১-২২ সালের ভয়াবহ খরার পেছনে উচ্চ তাপমাত্রার বড় ভূমিকা ছিল। অতিরিক্ত গরমে মাটি ও জলাশয়ের পানি দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়। ফলে খরা আরও তীব্র হয়। কেনিয়ার মার্সাবিত কাউন্টির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা হাসান নুয়া গুইও বলেন, তীব্র গরমে উটের শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এতে তারা নানা ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উটের মধ্যে রোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে দুধ উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। চলতি বছরে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের সময় উটের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। গ্রীষ্মের চরম গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, অতিরিক্ত খাদ্য এবং রোগ পর্যবেক্ষণের মতো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ১৯৮১ সালের পর থেকে উত্তর আফ্রিকায় তাপপ্রবাহের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে অঞ্চলটির কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণভাবে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা উট সহজেই সহ্য করতে পারে। ঘন প্রস্রাব, শুষ্ক মল ও মোটা লোমও তাদের গরম সহ্য করতে সাহায্য করে। কিন্তু তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে চলে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) উটস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ বেঙ্গুমি বলেন, সাহারা মরুভূমির অনেক এলাকায় এখন গ্রীষ্মে তাপমাত্রা নিয়মিত ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকছে। পানি, গাছপালা ও ছায়ার অভাব থাকায় উটের তাপজনিত চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
আলজেরিয়ার ঘারদাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদেলমাজিদ চেহমা বলেন, ৪১ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে উটের শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী জলজীববিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ এল খাসমি জানান, অতিরিক্ত গরমে উটের ওজন কমে যায়। শরীরে প্রদাহ দেখা দেয়। পেশি ও হাড়ের সমস্যা হয়। সূত্র: বিবিসি