গত পাঁচ বছরে পোলট্রিশিল্পের উৎপাদন খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। কাঁচামালের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। খামার পর্যায়ে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ের উল্লম্ফন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, লোডশেডিং এবং কর-শুল্কের বাড়তি চাপে পোলট্রিশিল্পে সংকট বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এসব কারণে পোলট্রিশিল্প এখন বিপর্যয়ের মুখে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। দাম বেড়েছে পোলট্রি এবং ডিমের।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোলট্রি খাতে যে ব্যয় আগে ছিল ১০০ টাকা, এখন তা বেড়ে ২১০ টাকা বা তার বেশি দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, এই খাতের প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশ থেকে কমে ৩.২ শতাংশে নেমে এসেছে।
খামারিরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বেশি খরচ হয় পোলট্রি খাদ্যে। মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৮০-৮৫ শতাংশই যায় এর পেছনে। পোলট্রি খাদ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। এর পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে করপোরেট কর, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও টার্নওভার করের বাড়তি চাপ খামারিদের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফরিদপুরের প্রান্তিক খামারি আমিনুল প্রধানের খামারে একসময় ভোরের আলো ফুটতেই কয়েক হাজার মুরগির কলকাকলিতে মুখরিত হতো। কিন্তু এখন বদলে গেছে পরিস্থিতি। আমিনুল প্রধান খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিদিন ১০ হাজার ডিম উৎপাদিত হতো। ক্রমাগত লোকসানের মুখে অর্ধেক শেড বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে পোলট্রি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আলমগীর হোসেন জানান, ব্যবসায় লাভের অঙ্ক এখন আর কোনোভাবেই মিলাতে পারছি না। আমার পোলট্রি ব্যবসায়ে ক্রমাগত লোকসান হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘একটি ডিম উৎপাদনে আমার খরচ হয় প্রায় ১০ টাকা, কিন্তু অনেক সময় বাজারে ৮ টাকায়ও বিক্রি করতে হয়। মাসের পর মাস লোকসান দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। আমার চারপাশের অনেকেই ইতোমধ্যে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। পরিস্থিতি এমন থাকলে আমাকেও হয়তো শিগগিরই ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে।’
আমিনুল প্রধান ও আলমগীর হোসেনের মতো অবস্থা দেশের হাজারও পোলট্রি ব্যবসায়ীর। উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া আর নামমাত্র মুনাফার কারণে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা এখন টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বিপিআইএর সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, দেশে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৪ শতাংশ। বিশ্বের অনেক দেশে এই করের হার শূন্য। উৎপাদন ব্যয় কমাতে বাংলাদেশে এআইটি শূন্য শতাংশ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পোলট্রি খাতে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করপোরেট কর আরোপ করা হলেও প্রতিবেশী প্রতিযোগী দেশগুলোতে এ হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। করপোরেট কর কমানোর দাবি করেন ব্যবসায়ী এই নেতা।
খামারিরা বলছেন, পোলট্রি খাদ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, ডিম বা মুরগির বাজারদর সেভাবে বাড়েনি। ফলে উৎপাদন খরচ ও মুনাফার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। লোকসানের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন তারা। গত পাঁচ বছরে পোলট্রি ফিডের দাম ৬০-৬৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০ সালে প্রতি বস্তা ফিডের দাম ছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, যা ২০২৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এর বিপরীতে পাইকারি পর্যায়ে ডিমের দাম বেড়েছে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ। আগে যে ডিম ৬-৭ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৮-৯ টাকা।
পোলট্রিশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ। ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদন, ডিম ইনকিউবেশন, খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকে। ফলে খামারিরা বাধ্য হয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। তবে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোয় সেই বিকল্প ব্যবস্থাও হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল।
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদনে। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্রয়লার বাচ্চার চাহিদা রয়েছে। তবে ইনকিউবেটরে নিরবচ্ছিন্ন তাপমাত্রা বজায় রাখতে না পারায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মতে, প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫০ লাখ বাচ্চা কম উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ফাহাদ হাবিব খবরের কাগজকে বলেন, কখনো কখনো ২০ ঘণ্টাও লোডশেডিং হচ্ছে। বাচ্চা যদি সঠিক সময়ে তাপমাত্রা না পায়, তাহলে সমস্যা হয়। এতে বাচ্চা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন নানা রোগও দেখা দেয়। শুধু ডিজেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি ডিমের উৎপাদন ব্যয় ২৫ থেকে ৫০ পয়সা এবং একটি বাচ্চার খরচ ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর ও শুল্কের বাড়তি চাপ। চলতি বাজেটে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কর ও শুল্ক বাড়ানোয় দফায় দফায় বেড়েছে পোলট্রির খাদ্য ও অন্যান্য উপকরণের দাম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে পোলট্রি খাতে কর সুবিধা কম। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় এ খাতে বিভিন্ন ধরনের কর অব্যাহতি এবং প্রণোদনা দেওয়া হলেও বাংলাদেশে উচ্চ কর কাঠামো বহাল রয়েছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদনসংশ্লিষ্ট খাতে এত উচ্চ কর নেই। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও বাংলাদেশে উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে উৎপাদনকারীদের ওপর পড়েছে এবং ভবিষ্যতে বাজার ও ভোক্তাদের ওপরও পড়বে। তিনি বলেন, বর্তমান কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামানো না হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা টিকতে পারবেন না। এতে পুরো খাত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত পাঁচ বছরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পোলট্রিশিল্প টিকে ছিল। কিন্তু চলতি বছরে কর ও শুল্ক বাড়ানোয় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের কম দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে তারা মাসের পর মাস লোকসান গুনছেন।
বাচ্চা উৎপাদনের এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য ও কাঁচামালের দাম। পোলট্রি খাতে মোট উৎপাদন খরচের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্যে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভুট্টা, সয়াবিন মিলসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে পোলট্রি ফিড উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।
উৎপাদন ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বগতি গত পাঁচ বছরে একটি উদ্বেগজনক চিত্র তৈরি করেছে। বিপিআইএ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে উৎপাদন খরচ বেড়েছিল ১১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৭০ শতাংশ, ২০২৫ সালে প্রায় ১৯০ শতাংশ ও ২০২৬ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ২০০ শতাংশে। অর্থাৎ ৬ বছরে উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। গত দুই সপ্তাহেই পরিবহন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগে যেখানে একটি ট্রাকে ৫ হাজার মুরগি পরিবহন করা হতো, এখন সেখানে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি হচ্ছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংগ্রহকারীর বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাজারে।
বাংলাদেশ ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে সোনালি ও রঙিন মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে সাধারণত ৫ থেকে ৮ লাখ বাচ্চা মারা যায়। তবে গত ২ সপ্তাহে বাজারে সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটিতে।
দেশি মুরগির সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে রোগবালাই বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। খামারিদের ভাষ্য, শীত শেষে কলেরা, রানিখেত ও বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে ব্যাপকহারে মুরগি মারা গেছে। ফলে অনেক খামারি নতুন করে উৎপাদনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।