কয়েক দিন আগেও রাজশাহীর আমবাগানগুলো ছিল উৎসবের রঙে রাঙানো। গাছে গাছে ঝুলছিল পাকা গোপালভোগ, গুটি আর লক্ষ্মণভোগের থোকা। চাষিদের চোখে ছিল ভালো দামের আশা। কিন্তু ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার আগেই সেই আশায় ভাটা পড়েছে। আমের রাজধানীখ্যাত রাজশাহীর মোকামগুলোতে এখন একটাই আলোচনা—দাম নেই, ক্রেতা নেই, লাভ নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমির আমবাগান থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে; যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। অনুকূল আবহাওয়া এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় এ বছর ফলনও হয়েছে সন্তোষজনক।
রাজশাহীর বৃহত্তম আমের মোকাম পুঠিয়ার বানেশ্বর হাটে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্যান, অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনে করে আম নিয়ে আসছেন চাষিরা। কিন্তু হাটে পৌঁছানোর পর অনেকের মুখেই হতাশার ছাপ। আড়তদাররা আমের মান যাচাই করে দর বলছেন, আর সেই দর শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন চাষিরা।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে আমের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। মৌসুমের শুরুতে যে গোপালভোগ আমের মণ বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২ হাজার টাকায়, এখন সেটি নেমে এসেছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। একইভাবে গুটি আমের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ১৫ মে বাজারে আসা গুটি আমের মণপ্রতি দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।
২৫ মে থেকে বাজারে উঠতে শুরু করা রানীপছন্দ ও লক্ষ্মণভোগ আমও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছে না। লক্ষ্মণভোগের মণ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকায়। গত বছর একই সময়ে এই আমের দাম দেড় হাজার টাকার নিচে নামেনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ৩০ মে থেকে বাজারে আসা ক্ষীরসাপাত বা হিমসাগর আম তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। এই জাতের আমের মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই দামও কিছুটা কম।
পুঠিয়ার ভুবননগর গ্রামের আমচাষি আমিনুল ইসলামের প্রায় ২০ বিঘা আমবাগান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সারের দাম, কীটনাশক, সেচ খরচ ও শ্রমিকের মজুরি সবই বেড়েছে। কিন্তু বাজারে এসে আমের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এত খরচ করে আম উৎপাদন করছি, কিন্তু বাজারে এসে সেই খরচই তুলতে পারছি না। এভাবে চলতে থাকলে অনেক চাষি আগামীতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন।’
শুধু আমিনুল ইসলাম নন, হাটে আসা অনেক চাষির কণ্ঠেই একই হতাশা। তাদের অভিযোগ, বাগানে ফলন ভালো হলেও বাজারে ক্রেতা কম থাকায় দাম ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে মৌসুমের শুরুতেই চাষিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করেই মূলত বাজারে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে মানুষের প্রধান ব্যস্ততা থাকে পশু কেনাবেচা, কোরবানি এবং মাংস সংরক্ষণ নিয়ে। ফলে ফলমূলের বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা কমে যায়। একই সময়ে কুরিয়ার ও পরিবহন সেবাও সীমিত আকারে পরিচালিত হওয়ায় ঢাকাসহ দেশের বড় বাজারগুলোতে আম পাঠানো ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে।
বানেশ্বর হাটের ব্যবসায়ী ইমান আলী বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে গোপালভোগের মণ ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা। এবার বাজারে আমের জোগান বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতা নেই। ফলে দাম কমে গেছে।’
একই কথা বলেন ব্যবসায়ী মো. রাজিবুর। তার মতে, ঈদের সময় মানুষ সাধারণত ফলের চেয়ে মাংস নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। ঈদে যানবাহন তেমন পাওয়া যায়নি, ফলে আমের চাহিদা কমে যায়। তবে এখন মানুষ কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে। এতে বাজারে আবার গতি ফিরতে পারে।
দুর্গাপুর উপজেলার পালি গ্রামের আমচাষি রাজু মিয়া বলেন, বর্তমান দামে আম বিক্রি করে শ্রমিক, পরিবহন ও বাগান পরিচর্যার খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘এবার ঈদের ছুটিতে গোপালের কপালই খারাপ। এই দামে আম বিক্রি করা মানে লোকসান গোনা।’
তবে ব্যবসায়ীরা পুরোপুরি হতাশ নন। তাদের ধারণা, ঈদের ছুটি শেষ হওয়ায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাজার আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। মানুষ কর্মস্থলে ফেরার সময় সঙ্গে করে আম নিয়ে যাওয়ায় চাহিদা বাড়বে। পাশাপাশি কুরিয়ার ও পরিবহনব্যবস্থা পুরোপুরি সচল হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহও স্বাভাবিক হবে।
জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাংগো, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই থেকে বারি আম-৪, ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি আম সংগ্রহ করা যাবে। ফলে সামনের দিনগুলোতে আমের বাজার আরও জমজমাট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহও বেশি। ফলে দামের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে মৌসুম যত এগোবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, বাজার পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে আশা করছি।’