রমজান উপলক্ষে ভোগ্যপণ্যের পর্যাপ্ত আমদানি থাকলেও বাজারে অস্বাভাবিকতার ইঙ্গিত মিলছে। অসাধু ব্যবসায়ীচক্র পণ্য খালাস না করে লাইটার জাহাজকে অস্থায়ী গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রমজানকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠছে সিন্ডিকেট। এরই মধ্যে বাজারে রমজানকেন্দ্রিক ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
লাইটার জাহাজকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার, নেপথ্যে ৯ প্রতিষ্ঠান
আকিজ গ্রুপ অব কোম্পানিজ, মেসার্স আর বি আগ্রো লিমিটেড, মেসার্স নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, মেসার্স নোয়াপাড়া ট্রেডার্স, মেসার্স শবনম ভেজিটেবল ওয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, স্প্রেকট্রা গ্রুপ, মেসার্স এন মোহাম্মদ, এস এস ট্রেডিং ও মেসার্স শেখ ব্রাদার্স নামক প্রতিষ্ঠান লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে গত ২২ জানুয়ারি চিঠি দিয়েছেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী। চিঠিতে তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঁচ কর্ম দিবসের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে পণ্য খালাস করে লাইটার জাহাজগুলো ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। অন্যথায় এসব আমদানিকারকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে চিঠিতে।
লাইটার জাহাজ শেখ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘পণ্য খালাস হচ্ছে। তবে সেটা গতিশীল নয়। মুনাফার আশায় বেশির ভাগ লাইটার জাহাজ মোংলা বন্দরের দিকে চলছে। আবার অনেক আমদানিকারক লাইটার জাহাজকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাই লাইটার জাহাজের সংকট আছে। ফলে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বৈশ্বিক ক্রম তালিকায় পিছিয়ে পড়ছে বন্দর। পাশাপাশি অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোকে ডেমারেজ (জরিমানা) গুনতে হচ্ছে, যা শেষমেষ ভোক্তার কাঁধে গিয়ে পড়বে। দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ না নিলে রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা আছে।’
বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) সহসভাপতি নাজমুল হোসাইন হামদু দাবি করেন, লাইটার জাহাজগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অনেক আমদানিকারক লাইটার জাহাজে পণ্য রেখে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, মজুত, স্থানান্তর, পরিবহন, সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণন (ক্ষতিকর কার্যক্রম প্রতিরোধ) আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত পরিমাণের বেশি খাদ্যদ্রব্য মজুত করা বা সরকারি নির্দেশনা অমান্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে ২ থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড বা উভয় শাস্তির বিধান রয়েছে।
বন্দরের বহির্নোঙরে ভাসছে শতাধিক জাহাজ
চলতি মাসের একেবারে শুরুতে বন্দরের বহির্নোঙরে ৯৪টি পণ্যবাহী বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) ছিল। লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে ১৪ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০টিতে। বন্দর ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত বহির্নোঙরে অবস্থান করছিল ১২৬টি বড় জাহাজ। এর মধ্যে ৮১টি জাহাজে পণ্য খালাস কার্যক্রম চললেও ৪৫টি জাহাজ অলস বসে আছে। এসব জাহাজে আমদানি করা রমজানের ভোগ্যপণ্য গম, সয়াবিন, ছোলা, ডাল, চিনি রয়েছে। এ ছাড়া কিছু জাহাজে সার, পাথর, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট, সিমেন্টের ক্লিংকার ও কয়লা রয়েছে। পণ্য খালাস করতে এসব জাহাজকে এখন ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। অপেক্ষমাণ জাহাজের প্রতিটিকে দিনে ১৬ লাখ টাকা ডেমারেজ (জরিমানা) গুনতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি বড় জাহাজ থেকে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস হয়। বর্তমানে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা বিবেচনায় ৪০০ থেকে ৫০০টি লাইটার জাহাজের চাহিদা রয়েছে। অথচ লাইটার জাহাজ মালিকরা জানিয়েছেন, সেখানে গত দুই মাস একটি বড় জাহাজের জন্য একটি করে লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতির এখনো কোনো উন্নতি হয়নি।
বাণিজ্য উপদেষ্টার দাবি
গত রবিবার আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ে টাস্কফোর্সের সভা শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন জানিয়েছেন, গত বছরের চেয়ে এবার নিত্যপণ্য ৪০ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে, তাই এবার দামটা মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে। ব্যবসায়ীরা আশ্বস্ত করেছেন নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। আসছে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দাম বাড়বে না বরং কিছু কিছু পণ্যের দাম আরও কমবে।
বাজার পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি ছোলার কেজিতে ৫ টাকা, বুটের ডালে ৩ টাকা, চিনির কেজিতে ৩ টাকা ও পাম অয়েল লিটারে ৪ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ছোলা ৭৫ টাকা, বুটের ডাল ৪৮ টাকা, চিনি ৯৪ টাকা ও প্রতি লিটার পাম অয়েল ১৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রমজানের আগেই ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ায় শঙ্কা প্রকাশ করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. আবু মোতালেব বলেন, ‘রমজানের সময় ঘনিয়ে আসতেই ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। চিনির কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে গেছে। আগে প্রতি কেজি খোলা কিনতাম ৯৫ টাকায়। এখন কিনছি ১০৫ টাকায়। রমজানে এমনিতেই ব্যয় বাড়ে। তার ওপর রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের চাপ ও ভোগান্তি বাড়ে। সরকার এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে আশা রাখি।’
আমদানির চিত্র
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রমজানকে লক্ষ্য করে সেপ্টেম্বর থেকে ভোগ্যপণ্যের আমদানি শুরু হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৫ হাজার ৮৫১ টন ছোলা, ৭ লাখ ৭ হাজার ৯৭৯ টন সয়াবিন তেল ও ২ লাখ ৬৭ হাজার ৪১ টন ডালজাতীয় পণ্য খালাস হয়েছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘একসময় কনটেইনারে বেশির ভাগ পণ্য আমদানি হতো। এখন বেশির ভাগ পণ্য আসছে বাল্ক জাহাজে। এসব পণ্য লাইটার জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নেওয়া হয়। কিন্তু লাইটার জাহাজসংকটের কারণে বহির্নোঙরে জাহাজের চাপ তৈরি হয়েছে। সামনে রমজান। যথাসময়ে পণ্য খালাস না হলে সাপ্লাই চেইন ঠিক থাকে না। তখন বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।’
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘লাইটার জাহাজ খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। এ সমস্যাগুলো সমাধানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যা খুবই দুঃখজনক। তাই সব মহলের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।’
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘লাইটার জাহাজকে গুদাম হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি পুরোনো। কারণ আমদানিকারক নিজের গুদামে পণ্য রাখলে সেটা অভিযানে ধরা পড়ে। তাই লাইটার জাহাজে সাগরে ভাসিয়ে রাখা তাদের জন্য নিরাপদ। এতে করে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। অথচ এবার পর্যাপ্ত পরিমাণে ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’