রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন আধুনিকায়নে প্রস্তাবিত ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফান্ড’ গঠনে অসম্মতি জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বৈদেশিক ঋণের টাকায় এই ধরনের তহবিল গঠন করলে সরকারের ঋণের বোঝা আরও বাড়বে–এমন আশঙ্কা থেকেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অর্থ বিভাগ থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই অনাপত্তির কথা জানানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে ঋণের চাপ নেওয়া সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট’ (বিক্যাপ)-এর আওতায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বাস রুট র্যাশনালাইজেশন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই পরিকল্পনারই একটি অংশ ‘ঢাকা বাস মডার্নাইজেশন প্রোগ্রাম’। বাস পরিচালনার আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের আওতায় ৪২৭ কোটি টাকার একটি ‘এনডাউমেন্ট ফান্ড’ বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের মতামত চাওয়া হলে তারা সম্প্রতি নেতিবাচক সাড়া দেয়। অর্থ বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে এই জাতীয় ফান্ড গঠন করা হলে বৈদেশিক ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পাবে। বিধায় এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের অসম্মতি প্রদান করা হলো।
যা ছিল প্রকল্প প্রস্তাবে
তহবিল নিয়ে জটিলতা থাকলেও ঢাকার লক্কড়-ঝক্কড় বাস সরিয়ে ৪০০টি অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক বাস (ই-বাস) নামানোর কাজ শুরু করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এই বাসগুলো নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আদতে কাজ কিছুই এগোয়নি।
বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টে ২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল। সরকারি তহবিল থেকে ৩৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা হয়েছিল। এই প্রকল্পের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।
অবকাঠামো পরিকল্পনায় গাবতলী ও জোয়ার সাহারাসহ তিনটি স্থানে ৭৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চার্জিং ডিপো নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছিল।
ডিটিসিএর তথ্যমতে, যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ঢাকার বায়ুদূষণের ২৫ শতাংশই আসে পুরোনো ডিজেলচালিত বাস থেকে। নতুন প্রকল্পে পুরোনো বাস স্ক্র্যাপ বা ভেঙে ফেলার জন্য বাস মালিকদের ৮৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’ চালু করার কথা বলা হয়েছিল। এতে যাত্রীরা স্মার্ট কার্ডে ভাড়া পরিশোধ করতে পারবেন এবং অ্যাপের মাধ্যমে বাসের রিয়েল-টাইম অবস্থান জানতে পারবেন বলে প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
হাল ছাড়তে নারাজ প্রকল্প কর্মকর্তারা
অর্থ বিভাগের আপত্তির পর এখন ৪২৭ কোটি টাকার বিশেষ তহবিলটির বিকল্প উৎস কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে সড়ক পরিবহন বিভাগ। এ বিষয়ে জানতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আরবান ট্রান্সপোর্ট অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তারও উত্তর দেননি তিনি।
বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টের দায়িত্বে রয়েছেন ডিটিসিএর ট্রান্সপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার কে এম তৌফিকুল ইসলাম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা নগরের গণপরিবহন খাতের স্থিতিস্থাপকতার কথা চিন্তা করে এই প্রকল্পে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফান্ড গঠনের প্রস্তাব রেখেছিলাম। এখান থেকে যে লভ্যাংশ আসত, তা পরিচালন ব্যয়ের জন্য যথেষ্ট হতো না। তাই আমরা এখানে ভর্তুকি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিলাম। এখানে সরকার যদি বিনিয়োগ করে, তাহলে এই খাত থেকে ভালো আয় করাও সম্ভব।’
অর্থ বিভাগ নারাজির চিঠি দিয়েছে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। মন্ত্রিপরিষদ গঠনের আগে অর্থ বিভাগের এই চিঠি পেয়ে প্রকল্প কর্মকর্তারা অবাক হয়েছেন। তারা এখন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফান্ড গঠনের প্রস্তাব নতুনভাবে সাজিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সভায় নতুন করে উপস্থাপন করবেন। গত ৩ মার্চ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করেছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। নানা আলোচনায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রতিনিধিরা এখনো এই খাতে বিনিয়োগ করতে সম্মত রয়েছেন বলে দাবি করেন তৌফিকুল ইসলাম।