রিকশা থেকে নেমে ভাড়ার ঝামেলা চুকাতে না চুকাতেই আকাশ কালো করে আসা মেঘ আরও ঘন হয়ে এল। সঙ্গে শুরু হলো শোঁ শোঁ হাওয়া আর ঝুম বৃষ্টি। ফাহিম তাড়াহুড়োয় চালকের হাতে ২০ টাকার নোট গুঁজে দেয়। প্রবল বর্ষণ, হাওয়ার তোড়ে টেকা দায়।
বৃষ্টির কণা তীরের ফলার মতো পিচঢালা রাস্তাকে বিদ্ধ করতে মশগুল। আশপাশের দোকানগুলো সব ঝাঁপি নামিয়ে নিতে শুরু করেছে। মোড়ের কোনে টং দোকানে অবশ্য চিত্র ভিন্ন। স্বচ্ছ কাচে টলটলে চায়ে চামচ নড়াচড়ার টুংটাং শব্দ জোরালো হয়ে উঠেছে। কাকভেজা হয়ে সেখানে জড়ো হচ্ছে নানা মানুষ। কার কোন পেশা, কোন শ্রেণি, এর যেন কোনো ভিন্নতা নেই। বর্ষারানির এই কল্যাণ অঞ্জলি আচমকাই নজরুলের সাম্যবাদকে যেন হঠাৎই জীবন্ত একখণ্ড ক্যানভাসে ধারণ করে নিয়েছে ছোট্ট স্টলটায়। ফুটপাতে ডাস্টবিনের কাছ ঘেঁষে ভাড়ার টাকাটা মিটিয়ে নিতে নিতে আড়চোখে সেদিকে নিজের জন্য কোনো জায়গা পাওয়া যায় কি না সেটা দেখে নেয় ফাহিম।
–মনে হচ্ছে জুটে যাবে। না গেলেও জুড়তে হবে।
মনে মনে বলে ফাহিম। রিকশার চালক ব্যাটা ততক্ষণে উধাও। তিন চাকার যানটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে থাকা খন্দটা এখন ঘোলা পানিতে টইটম্বুর। দূরের রাস্তায় টাঙানো কোচিং সেন্টারের ব্যানারগুলোকে আঁকড়ে ধরে কটা কাক জিরোচ্ছে।
‘শালাদেরই সুখ। যেখানে দেখ, সেটে পড়। ব্যাস।’
অদ্ভূতুরে সব ভাবনা পকেটে ভরে, দৌড়ে একে ওকে ডিঙিয়ে চায়ের দোকানে ফাহিম যতক্ষণে পৌঁছেছে, ততক্ষণে ও ভালোই কাকভেজা হয়ে পড়েছে। লম্বা শুকনো মতো এক মধ্যবয়স্ক আয়েশ করে পিলারে পিঠ ঠেকিয়ে সুখটান দিচ্ছিল।
–একটু সরবেন প্লিজ। দাঁড়াতাম একটু।
কণ্ঠে অনুনয় ফুটলেও ভেতরে রাগে ফেটে পড়ছে ফাহিম। ভদ্রলোকের কী কমনসেন্সের অভাব, না আসলেই ইডিয়ট? বাইরের অবস্থা কি দেখছে না? এসময় এমন আজব আচরণের মানে কী? লোকটা ফাহিমের কথাটা তেমন আমলে নিল না মনে হয়। দায়সারাভাবে কেবল কিঞ্চিত সরে দাঁড়াল। ফাহিম মুখে কথা না বাড়িয়ে এবারে গায়ের জোরে ঠেলে ঢুকে পড়তেই হা হা করে ওঠে জনৈক ব্যক্তি।
–চোখের মাথা খেয়েছ? আজকালকার ছেলেপেলে বড্ড বেয়াদব। কী আচরণ কোথায় কেমন করে করতে হয় সেটাও জানে না।
ফাহিমের ইচ্ছে হচ্ছিল ভদ্রলোককে এক হাত দেখে নিতে কিন্তু নিজেকে সামলে নেয়। একটা মেকি লাজুক হাসি মুখে ঝুলিয়ে এবার হুকুম ছোটায়–
–মামা, একটা চা সঙ্গে পুরি। দুটা।
–চিনি কম, না ছাড়া?
আশপাশ থেকে প্রচুর চাহিদার ডাক ভেসে আসছে। এটাকেই বলে সময়ের চাহিদা। কী ব্যবসাটাই হঠাৎ সেরে নিচ্ছে ব্যাটা। ক্যাশবাক্স ফুলে উঠছে রীতিমতো। শুধু কি চা? বিস্কুট, চানাচুরের প্যাকেটও উবে যাচ্ছে একের পর এক। ফাহিম মুচকি হাসে।
–চিনি কম, লিকার বেশি।
কথাটা প্রায় চিৎকার করে বলে ও।
–সময় লাগব।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে চা ওয়ালা। এক হাতে রেডিওর নব ঘুরিয়ে নিতেই স্টেশন ক্যাচ করে ফেলে। জব্বর বাংলা মুভির গান চলছে। ভিড়ের মধ্যে একটা উৎসবমুখর আমেজ তৈরি হয়। কেউ গুনগুন স্বরে গলা মেলায়, কেউ আবার ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাসায় নিজের খবর জানিয়ে দিতে।
–কী বললে? দুই কেজি গোশত, আর এক প্যাকেট বিরিয়ানির মসলা? কোনটা? রাঁধুনির? ওহ। এগুলো কেবল?
ওপ্রান্ত থেকে হয়তো আরও কিছু যোগ হয়ে যায় লিস্টে। সেটা ভদ্রলোকের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে
–চাল সেদিনই আনা হলো না, দশ কেজি? রাক্ষসের পেট না অন্যকিছু? ইয়ার্কি নাকি? একটু চোখ-কান খোলা রাখ। সব কাজের লোকের ওপর চাপালে হবে? সারা দিন কেবল টিকটক আর ছাতামাথা। তা তেল লাগবে না, ওটাও...
ভুঁড়ি ভাসানো ভদ্রলোক দারুণ চটে কথাগুলো বলছিল। পাশেই আরেক তরুণের মুখে লাজুক হাসি। এক হাতে মুখ ঢেকে গলা যতদূর সম্ভব নামিয়ে সে বলছে–
–শোন না! বৃষ্টি থেমে গেলেই বেরিয়ে পড়। এই টিউশন ফিউশন কিছু একটা আছে বলে ঝেড়ে দাও। মগবাজারের ওই যে কফি শপ, ওখানেই আসছি। একটু ম্যানেজ কর না, প্লিজ।
ছেলেটির গলায় চরম আকুতি। আহা ভালোবাসা! ফাহিমের হাসি পেয়ে যায়। রঙিন ভাবনায় বুনে চলা স্বপ্নের পৃথিবী আর বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত রূঢ় জগতের দুই উদাহরণ চোখের সামনেই এই ছাপড়ি দোকানে কী সুন্দরভাবে ফুটে উঠছে! প্রেম চির সুন্দর, শাশ্বত সত্যি। তবে জীবনের আসল সংগ্রামের ঝড়টা সামলে নিতে গিয়ে এই প্রেমের গাঢ় নিখাদ যে আসল সত্য সেটা স্পষ্ট করে দেখায় যেন এই হিসাবের অঙ্কটাই।
বাজারের ফর্দ ফেঁদে নেওয়া ভদ্রলোক তার ফোন নামিয়ে এখন চায়ে চুমুক দিতে ব্যস্ত। মুখে এখন বিরক্তির বদলে শিশুসুলভ তৃপ্তির ছায়া পড়েছে। উদাসী সেই প্রেমিকও আপনমনে বিড়ির ধোঁয়ায় মজেছে। টোকাই গোছের এক বালক হাত পেতে সাহায্য চাইলেও কেউ আমলে নিচ্ছে না। ওর কাঁধে ঝোলানো বস্তা থেকে একটা বেড়াল ছানা উঁকি দেয়। ফাহিম জিবে চুকচুক আওয়াজ তুলতেই ওটা ভয় পেয়ে বস্তায় ঢুকে পড়ে–
–দ্যান না ভাইয়া কিছু, চারডা খামু
ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ফাহিম মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিবেকের উল্টো ছায়াটা তাড়া করে বেরালেও কিছু করার নেই। অপরাধবোধ তাড়া করছে একটু ঠিক। তবে ওর মতো নেহাত এক মামুলি টিউটরের এতটা উদারতা কি আসলে মানবতা প্রদর্শন করে না বিলাসিতা, সেই ভাবনাটাও ছায়াসঙ্গীর মতো পিছু নেয়।
টিউশনে আজই হাজার চারেক টাকা পকেটে ঢুকেছে। বাড়ি পাঠাতে হবে আড়াই হাজারের মতো। বাকিটা নিজের। তার ওপর আজ যা ওয়েদার মনসুরের দোকানে বসে একটা দেড় শ টাকার বিরিয়ানি আর সোডার বোতল গলায় ঢাললে এই জম্পেশ বৃষ্টি পুরোই জমে যাবে। সত্যি বলতে ওই হোৎকা ভুঁড়িওয়ালা ভদ্রলোক যখন গিন্নিকে ঝেড়ে নিচ্ছিল চাল-মাংস-মসলার স্বাদ চাখবার পাগলামোটা তখন থেকেই মাথায় চেপেছে। তাই আজ
এ না হলে হচ্ছেই না। ভরপেটে পেট পূজা সেরে এরপর মেসে ফিরে আড্ডা, রাতে কেবল একটা বিড়ি! ব্যাস, ছাপোষ জীবনে আর কী চাই? আবোলতাবোল চিন্তার ঘোরে ঘুরপাক খাওয়ার মাঝেই ফাহিমের ভ্রম কাটে একটা গলার স্বরে। নাহ! সেই টোকাই হাওয়া হয়েছে ইতোমধ্যেই। সামনে সেই ম্যাজিক্যাল উদরের মালিক ভদ্রলোক। একটু তোষামোদি তেল গলায় মিশিয়ে বলে লোকটা–
–দুটো পাঁচ শ হবে? খুব উপকার হয়। আসলে ভাঙতি...
ভদ্রলোককে কথা শেষ করতে না দিয়ে ফাহিম হিপ পকেটের মানিব্যাগ বের করে আনে। নতুন কড়কড়ে এক হাজারের তিনটে নোট আর দুটো পাঁচ শ। ছাত্রের মা আজ যখন হাতে দিচ্ছিল কী দারুণ অনুভব হচ্ছিল। বেচারা এই লোককে সেই দুটো পাঁচশ দিয়ে একটু উপকার না হয় করাই হলো। ক্ষতি কী? তাছাড়া এই লেনদেনে মাঝেমধ্যে কেমন একটা সাহেবি মেজাজ চাপে। বিস্কুটের এক প্রান্ত কামড়ে ব্যাগে থাকা টাকাগুলো গুণতে গিয়েই চক্ষু চড়কগাছ!
আরে? পাঁচ শ টাকার নোট একটা কেন? দিব্যি দুটো ছিল। গেল কই আরেকটা? পকেটমার? আরেহ ভ্যাট! পকেটমার পকেট কাটলে তো পুরোটাই চলে যেত। তবে? হিসাব মিলিয়ে নিতে ফ্ল্যাশব্যাকে হাতড়ে বেরায় ফাহিম। জোর বাতাস, বৃষ্টি, ঝড়, রিকশা ভাড়া। সর্বনাশ! ভাড়া! হ্যাঁ। ওখানেই কাণ্ড ঘটে গেছে। ভুলে বিশ টাকার জায়গায় ব্যাটাকে পাঁচ শ ধরিয়ে দিয়েছে ও। দুটো নোটের হুলিয়ায় প্রচণ্ড মিল থাকাতেই এই প্যাঁচ। তাড়াহুড়োতে কেউই খেয়াল করেনি ওটা তখন। নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়। কোনো কথা? বলা কওয়া নেই পুরো পাঁচ শ গায়েব! পাশের লোকটা তাড়া লাগায়
–বলছি, ভায়া...
–সরি। আসলে দুটো হবে না আমার।
বিতৃষ্ণা নিয়ে অন্যদিকে ফিরে কথাটা বলে ফাহিম। লোকটা এতটা সময় অপেক্ষার পর এমন কথায় স্বভাবতই রূষ্ট হলো। মুখে কাষ্ঠ হাসি ফুটিয়ে এবার আরেকজনের দিকে একই অনুরোধ করে।
‘তোর তো ব্যাটা খুচরো দরকার কেবল, আর এদিকে আমার...’
ভাগ্যকে দুষতে গিয়েই হঠাৎ ফাহিমের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। আচ্ছা প্রতি ঘটনার একটা উল্টো পিঠও তো থাকে। এখানেও হয়তো তাই। ভুলে হাতবদলে ফেলা ওই পাঁচ শ টাকা যেন সঠিক অঙ্কটাই মিলিয়েছে, খানিক ভিন্ন সূত্রে। হয়তো আজ মনসুরের বিরিয়ানির প্লেটে সন্তুষ্টির ঢেঁকুর তুলে নেওয়াটা ফাহিমের জন্য নয়, ওই অভাবী চালকের প্রাপ্তির খাতার জন্য তোলা ছিল। হুট করে গড়মিলে ফেলা হিসাবটা দিনশেষে হয়তো আজ
মিলিয়ে দেবে ওই চালকের কোনো ইচ্ছাকে। তার জন্য নিজের এই পাঁচ শ টাকা খোয়ানো সে তেমন বিশেষ কিছু ক্ষতি নয় বরং লাভই বৈকি!
ফাহিম হাসে। বৃষ্টি থেমেছে। ভ্যাপসা ভাবটা কেটেছে। চায়ের দামটা মিটিয়ে দেয় ফাহিম। অবশ্য এবারে সাবধানেই দফারফা করে। আজব দোলাচলে দুলছিল চিন্তাগুলো। ওগুলোকে সঙ্গী করেই এরপর পা বাড়ায় সামনে। একটু দূরে সেই টোকাই ছেলেটা বসে। বেড়ালছানাটা ওর গাঁ-ঘেঁষে বসে আছে। ফাহিম চোখ ফিরিয়ে নেয়। দূরত্ব মাপার জন্য এবার আরেকটা রিকশার উদ্দেশ্যে হাত বাড়ায় ও। যানটা দ্রুত গতিতে ওর দিকে ছুটে আসছে। ঠাণ্ডা হাওয়ায় দারুণ লাগছে। ফাহিম ওপরের দিকে মুখ তোলে। সান্ধ্য আকাশে তখন এক আশ্চর্য সোনালি রোদের প্রসাধন ছড়িয়ে পড়ছে।