ছায়ানট (কলকাতা)-এর সংগ্রহ থেকে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু দুর্লভ ছবিও সংযুক্ত করা হয়েছে বইটিতে, যা নিঃসন্দেহে নজরুলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ প্রাপ্তি বলে বিবেচিত হবে। সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে নজরুলচর্চায় নিয়োজিত ছায়ানট (কলকাতা)। ছায়ানটের উদ্যোগে কলকাতায় যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টসে সাত দিনব্যাপী নজরুলবিষয়ক প্রদর্শনী ‘আমারে দেব না ভুলিতে’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। সেদিন বহু গুণীজনের উপস্থিতিতে ‘চেতনায় নজরুল’ বইটির মোড়ক উন্মোচিত হয়।...
চেতনায় নজরুল: সু-সম্পাদিত একটি দুর্লভ আকর-গ্রন্থ
প্রদীপ আচার্য
‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব
তবু আমারে দেব না ভুলিতে’
লোকপ্রিয় এই নজরুল-সংগীতের বাণী আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের আত্মপ্রত্যয়ের কথা ব্যক্ত করে। প্রয়াণের অর্ধশতাব্দী পরও সুচেতনার কবি, মানবতার কবি নজরুলের সৃষ্টি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। অস্থির সময়ে তাঁর লেখা আমাদের শক্তি জোগায়, জীবনকে সঠিক পথে চালিত করে। তাই আজ মানবতা যখন বিপন্ন, পৃথিবীজুড়ে অশান্তির বাতাবরণ, ঠিক তখনই আমরা বারংবার ফিরে যেতে চাই তাঁর সৃষ্টির কাছে।
১৯৩৮ সালে কলকাতায় দৈনিক ‘কৃষক’ পত্রিকার অফিসে, জন-সাহিত্য সংসদের উদ্বোধনে সভাপতি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘কাব্যে ও সাহিত্যে আমি কী দিয়েছি, জানি না। আমার আবেগে যা এসেছিল, তাই আমি সহজভাবে বলেছি, আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না।’ নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তাঁকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
১৪৩২ বঙ্গাব্দে ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা সম্পাদিত ‘রোহিণী’ পত্রিকার উৎসব সংখ্যাটি বাংলা সাহিত্যের দুই কিংবদন্তি–কাজী নজরুল ইসলাম এবং জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টি ও তার গভীর আলোচনা দিয়ে সাজানো হয়। কলম ধরেছিলেন বর্তমান সময়ের বিদগ্ধ প্রাবন্ধিকরা। বাংলার সুশীল সমাজের কাছে এই পত্রিকা বিশেষভাবে আদৃত হয়। পত্রিকার নজরুল-সংক্রান্ত বেশ কিছু লেখা দুই বাংলার পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁদের কথা মাথায় রেখেই গৃহীত হয় বৃহৎ কলেবরে এই বই ‘চেতনায় নজরুল’-এর পরিকল্পনা। বর্তমান সময়ে দুই বাংলার বিশিষ্ট নজরুল গবেষকরা এই বইয়ের জন্য লিখেছেন। তাঁদের সবারই চেতনায় নজরুল লালিত। প্রতিটি লেখা তারই সাক্ষ্য বহন করে।
কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী এবং ভ্রাতুষ্পুত্র কাজী রেজাউল করিম আমাদের মধ্যে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও নজরুলবিষয়ক তাঁদের অন্তরঙ্গ স্মৃতিচারণা যে পাঠককে আবেগবিহ্বল করে তুলবে–এ কথা নিশ্চিত।
প্রবীণ ও নবীন নজরুল গবেষক, চিন্তকদের তথ্যসমৃদ্ধ, মননশীল প্রবন্ধের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এই বইটি। প্রবন্ধের বিষয়-বৈচিত্র্যও বইটির বিশেষ আকর্ষণ। প্রাবন্ধিকরা তাঁদের মতো করে নজরুলের সৃষ্টিকে বিশ্লেষণ করেছেন, তথ্য সংযুক্ত করেছেন। বইটির সম্পাদক সোমঋতা মল্লিক এবং ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা সেই লেখাগুলোকে একত্রিত করে নজরুলপ্রেমীদের উদ্দেশে চমৎকারভাবে নিবেদন করেছেন। তাঁদের ভূমিকা অনেকটা সেতুবন্ধনের। ড. পবিত্র সরকার, ড. বাঁধন সেনগুপ্ত, ড. রতন কুমার নন্দী, ড. সুমন গুণ, সৈয়দ হাসমত জালাল, ড. সুরঞ্জন মিদ্দে, স্বপন সোম, ড. সুমনপাল ভিক্ষু, গোপাল দাসসহ পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন বিদগ্ধ ব্যক্তির কলমে নজরুলের জীবন ও সৃষ্টির স্বল্প আলোচিত বিষয় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে কলম ধরেছেন মোস্তফা কামাল, এ এফ এম হায়াতুল্লাহ, রাশেদ রউফ, সাহাদাত পারভেজ, মৃত্যুঞ্জয় রায়, পীযূষ কুমার ভট্টাচার্য, শেলু বড়ুয়া এবং সাগর রশিদ প্রমুখ। বইটির সম্পাদকদ্বয়–সোমঋতা মল্লিক এবং ড. পার্থপ্রতিম পাঁজার লেখাও স্থান পেয়েছে বইটিতে।
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রয়াত কল্যাণী কাজীকে, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় দুই বাংলার নজরুল চর্চায় আলোকবর্তিকা হয়ে থেকেছেন। সেই সঙ্গে এই তরুণ প্রজন্মকেও, যারা নজরুল- চেতনায় আলোকিত হয়ে সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলবে।
প্রবন্ধের পাশাপাশি আরেকটি চমকও রয়েছে। ছায়ানট (কলকাতা)-এর সংগ্রহ থেকে কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু দুর্লভ ছবিও সংযুক্ত করা হয়েছে বইটিতে, যা নিঃসন্দেহে নজরুলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ প্রাপ্তি বলে বিবেচিত হবে। সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে নজরুলচর্চায় নিয়োজিত ছায়ানট (কলকাতা)। গত ২৩ মে ছায়ানটের উদ্যোগে কলকাতায় যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টসে সাত দিনব্যাপী নজরুলবিষয়ক প্রদর্শনী ‘আমারে দেব না ভুলিতে’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। সেদিন বহু গুণীজনের উপস্থিতিতে ‘চেতনায় নজরুল’ বইটির মোড়ক উন্মোচিত হয়। বইটির ক্ষেত্রে আরও একটি বিশেষ প্রাপ্তি হলো শ্রদ্ধেয় চিত্রশিল্পী ওয়াসিম কাপুরের আঁকা প্রচ্ছদ চিত্র।
শ্রমসাধ্য, মননঋদ্ধ এ বইটি আক্ষরিক অর্থেই একটি আকর গ্রন্থ। নজরুলকে যাঁরা ভালোবাসেন, নজরুল চর্চা করেন, গবেষণা করেন তাঁদের জন্য এ বইটি নিঃসন্দেহে অবশ্য সংগ্রহযোগ্য একটি মূল্যবান সম্পদ।
এমন একটি বইয়ের নির্মাণ ও প্রকাশের জন্য ‘রোহিণী নন্দন’ প্রকাশনা সংস্থাকেও সাধুবাদ। তাঁদের এই আন্তরিক প্রয়াস বিশ্বব্যাপী নজরুলপ্রেমীদের কাছে সমাদৃত হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
কালীপ্রসন্ন সিংহের মৃত্যুর পর সাংবাদিক কৃষ্ণদাস পাল রায়বাহাদুর লিখেছেন, ‘তারুণ্যের অস্থির জলের তলদেশে উদারতার একটি রূপালি স্রোত বর্তমান ছিল, উদারতা, ভাল সহকারিতা এবং উচ্চ নজর, যা খুব কম লোকই প্রশংসা না করে থাকতে পারে। তার সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও কালীপ্রসন্ন ছিলেন একটি উজ্জ্বল চরিত্র।’…
মহাকাব্যের অনুবাদক কালীপ্রসন্ন সিংহ
বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্য ‘মহাভারত’ (১৮৫৮-৬৬) বাংলা অনুবাদ এবং ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ (১৮৬১) গ্রন্থ লেখার মাধ্যমে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। বড় কীর্তি হলো, তার সম্পাদনায় ১৮ পর্ব মহাভারত গদ্য আকারে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, যা এখনো ব্যাপকভাবে পঠিত। পুরো গ্রন্থটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দ্বারা পরিদর্শিত হয়। ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্র। তার রচিত মহাভারত অনুবাদটি মহারানি ভিক্টোরিয়াকে উত্সর্গ করেছিলেন। তিনি একাধারে লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, লোকহিতৈষী, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির একজন মহান পৃষ্ঠপোষক। জন্ম ১৮৪০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ‘সিংহ’ পরিবারে। পিতা বাবু নন্দলাল সিংহ ও মাতা ত্রৈলোক্যমোহিনী দেবী। তিনি ১৮৭০ সালের ২৪ জুলাই পরলোকগমন করেন।