সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা এতটাই স্পষ্ট যে, প্রায়ই সেটা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি তার বৌদ্ধিক ভাবনার স্তরকে অনেকটাই নিচে নামিয়ে আনেন। বিতর্ক তৈরি করেন।...
কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির যখন আমাদের সাহিত্যভুবনে সর্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন, তখনই তাকে ‘তৃতীয় শ্রেণির’ লেখক বলে উল্লেখ করেছেন সলিমুল্লাহ খান। খানের অবশ্য চমক দিয়ে কথা বলার অভ্যাস স্বভাবজাত। সেই চমকের মধ্যে অবধারিতভাবে থাকবে পুথিগতবিদ্যার একপ্রস্থ বয়ান। সেই বয়ানের উদ্দেশ্যও কখনো সুপ্ত থাকে না। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি বেছে নিয়েছেন সেরকম একজন লেখককে, সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে যার খ্যাতি সলিমুল্লাহ খানের চাইতে বেশি। রাজনৈতিকভাবেও যাকে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে সহজেই ঘায়েল করা যায়। এভাবেই তিনি মাঝে মাঝে সৃষ্টিশীল লেখকদের নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেন। এটা তিনি করতেই পারেন। তবে তা কতটা যৌক্তিকভাবে করছেন, সেটাই বিবেচনার বিষয়।
কৌতুকের বিষয় হচ্ছে, সলিমুল্লাহ খান শহীদুল জহির সম্পর্কে যে কথাগুলো বলেছেন, তা তিনি পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেননি–‘শহীদুল জহির সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না, ওনাকে আমি প্রথম শ্রেণির দূরের কথা, তৃতীয় শ্রেণির লেখকও মনে করি না। তার সাহিত্যের ভাষা বোরিং। আগে (আর) তিনি যে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র এঁকেছেন সম্পূর্ণ ফলস।’ প্রথমেই দেখা যাচ্ছে, তিনি শহীদুল সম্পর্কে কী বলবেন, তা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। ‘মন্তব্য করতে চাই না’র মধ্যে সেই দ্বিধার প্রকাশ লক্ষ করছি। এর পরে বলেছেন, শহীদুলের ভাষা বোরিং। এই ‘বোরিং’ বলতে আসলে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। সবশেষে যে কথাটি বলেছেন, সেটা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। শহীদুল মুক্তিযুদ্ধের যে চিত্র এঁকেছেন তা সম্পূর্ণ ফলস্। লক্ষণীয় আংশিক বা ষাট ভাগ, চল্লিশ ভাগ ফলস্ নয়, ‘সম্পূর্ণ’ ফলস্। এই শেষের বাক্যটিরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা নেই। এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, তৃতীয় শ্রেণি নয়, তিনি শহীদুল জহিরকে কোনো লেখকই মনে করেন না।
সলিমুল্লাহর এই উক্তির উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখছি, তিনি এই কথাগুলো বলেছিলেন ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। ১৯৭১ সালের এই মার্চেই শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। সলিমুল্লাহ কোন প্রেক্ষাপটে এই কথাগুলো বলেছেন, তা এ থেকে স্পষ্ট হয়। তিনি যখন এই কথাগুলো বলছেন, তখনো বিগত সরকার ক্ষমতায়। এ কারণেই হয়তো মন্তব্য করার ব্যাপারে তিনি কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন–কোনো মন্তব্য করতে চাই না বলেছিলেন। দুই বছর আগে বলা তার কথাগুলো সেসময় প্রকাশ্যে আসেনি। এল প্রায় দুই বছর পরে, যখন এ ধরনের উক্তি করা সহজ হয়ে গেছে। রাজনৈতিকভাবে শহীদুল জহিরের মুক্তিযুদ্ধের চিত্রায়নকে খারিজ করা যায়।
আরেকটি বিষয় লক্ষ করলাম। সলিমুল্লাহর এই উক্তির পর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তিনি এখনো শহীদুল জহিরকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো লেখা লেখেননি। নতুন করে বক্তৃতা করেছেন বলেও জানা নেই। সম্প্রতি তার এই বক্তব্য নিয়ে আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে বিতর্কের ঝড় উঠলেও তিনি বিস্তৃতভাবে এর ব্যাখ্যা দেননি। শুধু তার নামে তৈরি ওয়েবসাইটে একটা লেখা চোখে পড়ল, যেখানে শহীদুল জহির সম্পর্কে সলিমুল্লাহ যে সঠিক কথাই বলেছেন সেরকম একটি লেখা লিখেছেন অন্য একজন। কিন্তু সেই লেখাটি নানা দিক থেকে বিভ্রান্তিতে ভরা।
সলিমুল্লাহ খানের একটা সুবিধা হচ্ছে, তিনি যখন কোনো উক্তি করেন তারপরই অনেকে সমস্বরে বলতে থাকেন–হ্যাঁ, কথাটা তো ঠিক। সলিমুল্লাহ খান ঠিকই বলেছেন। এতে তাদের কথাগুলো যে রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডা হয়ে দাঁড়ায় সেটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। সলিমুল্লাহর অনুসারীরাও এটা জানেন। তবে এবার উল্টোটাও ঘটেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বা দু-একটি অনলাইন পত্রিকায় তার এই কথাকে সমর্থন করার পরিবর্তে সমালোচনাই হয়েছে বেশি।
বাংলাদেশে যাকে বিতর্ক বলা হয় তা আসলে বিতর্ক নয়, বিরূপতা বা বিদ্রুপ বলা যায়। সলিমুল্লাহর উক্তিকে কেন্দ্র করে এরকমই তীক্ষ্ণ বিদ্রুপবাণ ছুড়ে দিয়েছেন কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ। তিনি বলেছেন, “সলিমুল্লাহ খান প্লেটোও হতে পারেন নাই। যদিও ছফারে সক্রেটিস বানাতে চাইছিলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত বানাতে পারছেন ‘গরিবের রবীন্দ্রনাথ’। আর এদিকে শিল্পবোধহীন বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি নিয়ে বই পড়তে পড়তে নিজে হয়ে উঠেছেন, একটা আশ্চর্য ডিকশনারি। নীলক্ষেতের ফুটপাথে এককালে যা কুড়ি টাকায় কিনতে পাওয়া যেত! কিন্তু গুগল/এআইর যুগে এখন আর যার দুই পয়সাও দাম নাই।”
দুই.
সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, শহীদুল মুক্তিযুদ্ধের যে চিত্র এঁকেছেন তা সম্পূর্ণ ফলস্। এই ফলস্ মানে মিথ্যা। এই মিথ্যার ব্যাখ্যা কী? আলবেয়ার কামু একবার বলেছিলেন, ‘উপন্যাস হলো সেই মিথ্যা যার মাধ্যমে আমরা সত্যকে প্রকাশ করি।’ একজন লিখেছেন, শহীদুল লাতিন আমেরিকার সাহিত্য অনুকরণ করেছেন, তাই তিনি গৌণ লেখক। সাহিত্যের এই অনুকৃতি ও সত্য-মিথ্যা আসলে কী, তা নিয়ে সাহিত্যতাত্ত্বিকরা বিস্তর তাত্ত্বিক কথা বলেছেন। মোটা দাগে তারা যেটা বলতে চেয়েছেন তা হলো, উপন্যাসের সত্য কোনো ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক সত্য নয়, এটি হলো মানবিক অভিজ্ঞতার গভীর সত্য। শহীদুলের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক লেখাকে এই প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করতে হবে। আসলে সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটা এতটাই স্পষ্ট যে, প্রায়ই সেটা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি তার বৌদ্ধিক ভাবনার স্তরকে অনেকটাই নিচে নামিয়ে আনেন। বিতর্ক তৈরি করেন।
এবার তৃতীয় শ্রেণির লেখক বা একেবারেই লেখক হিসেবে শহীদুল জহিরকে খারিজ করা প্রসঙ্গে বলি। নিঃসন্দেহে সলিমুল্লাহ খান সৃষ্টিশীল লেখক নন। সেই সক্ষমতা তার নেই। এ ক্ষেত্রে শহীদুল জহিরের সঙ্গে সলিমুল্লাহ খানের কোনো তুলনাই হয় না। শহীদুল জহির এ ক্ষেত্রে নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছেন। তার এই সৃষ্টিশীলতার চমকপ্রদ স্বীকৃতি আছে আমাদের প্রধান প্রধান সব লেখকের রচনায়। এই লেখায় স্থানাভাবে শহীদুল জহিরের সাহিত্যকৃতি সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে বলা সম্ভব হলো না বলে আমাদের দুজন প্রথিতযশা লেখককে উদ্ধৃত করছি। শহীদুল প্রসঙ্গে হাসান আজিজুল হক লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাহিত্যে একেবারেই আলাদা একটা জায়গা থেকে সমাজ-বীক্ষণ, ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমাজ আর সমাজের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি–শুরু করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। শহীদুল জহির হয়ে ওঠেন তাঁর প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। তবে উত্তরসূরি তার বেশি কিছু নয়, ছায়া-প্রতিচ্ছায়া নয়, ধ্বনির প্রতিধ্বনি নয়, এক নতুন ওয়ালীউল্লাহ নয় বরং ওয়ালীউল্লাহর ভেতর দিয়ে এক শহীদুল জহির, মৌলিক, ছাপিয়ে যাওয়া, চূড়ান্ত স্বতন্ত্র শহীদুল।’
শহীদুল জহিরের অকাল মৃত্যুর পর অবিচিয়ুরি হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একটা লেখার কিছুটা উদ্ধৃত করে এই লেখাটা শেষ করছি: ‘শহীদুল জহিরের মৃত্যু এতটাই অপ্রত্যাশিত যে তাতে দুঃখের থেকে বড় হয়ে ওঠে হতাশা এবং ক্রোধ। কেন চলে গেলেন এই অসময়ে, এরকম পরিপূর্ণ একজন লেখক, যাঁর হাত ধরে আমাদের কথাসাহিত্য যেতে পারত অনেক দূরে; যতটা দূরে যাওয়া যায়? তাঁর শেষ কাজ, শেষ উপন্যাস মুখের দিকে দেখি, যেটি বেরিয়েছিল ২০০৬-এ, পড়ে মনে হয়েছিল একটি নীরব পালাবদল যেন ঘটছে তাঁর লেখাতে, যেন একটা আলাদা গভীরতার সন্ধান তিনি পেয়েছেন জীবনে, প্রতিদিনের আলো-ছায়ার ভেতরে যেন একটা গূঢ় রহস্যের মাত্রা, যা খুব অজটিল জীবনকেও একটা আলাদা মহিমায় দাঁড় করিয়ে দেয় এবং সেই জীবনকে বর্ণনা করার তাঁর যে সংবেদী, জাদুবিস্তারী ভাষা ছিল তাতে যেন অতিরিক্ত কিছু শক্তি জমা হয়েছে। ঠিক যখন অতলস্পর্শিতার সাধনা তাঁকে সিদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি চলে গেলেন, যেন অন্য কোনো লোকের হাতছানিতে। তিনি কাজ ভুলে পাড়ি জমালেন, তাঁর গল্পের কোনো চরিত্রের মতো, কোনো কুহকাচ্ছন্ন পরিব্রাজকের মতো।’