আজকের শিক্ষার্থীরা হয়তো একটি নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে রাজপথে নেমেছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি রাষ্ট্রকে আরও বড় একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে–বাংলাদেশের রাজনীতি কি এমন একটি নতুন ভাষা নির্মাণ করতে পারবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বিশ্বাস, নির্দেশের চেয়ে সংলাপ এবং আধিপত্যের চেয়ে অংশগ্রহণ বেশি গুরুত্ব পাবে?...
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আবারও প্রমাণ করেছে, শিক্ষা কেবল পাঠ্যক্রম বা পরীক্ষার বিষয় নয়, এটা রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কেরও একটি সূক্ষ্ম সূচক। পরীক্ষা, শিক্ষা কার্যক্রম কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট–এ আন্দোলন কেবল কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি দেখলে বোঝা যায়, ক্ষোভের বড় অংশ তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সংকট মোকাবিলার ভাষাকে ঘিরে।
ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি তার রাজনৈতিক দর্শনে দেখিয়েছেন, ক্ষমতার স্থায়িত্বের মূল ভেতরে কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব নয়, বরং মানুষের সম্মতি, নৈতিক নেতৃত্ব এবং এমন রাজনৈতিক ভাষা, যা সমাজের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও বোধের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম।
কোনো কোনো আন্দোলন কোনো একটি ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও, সময়ের সঙ্গে সেটা দেখা যায় গভীর সামাজিক সংকটের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়। তখন আন্দোলনের দৃশ্যমান কারণটি আর মূল কারণ থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে বহু দিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, অবিশ্বাস আর বিচ্ছিন্নতার উপলক্ষ। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পরীক্ষা সূচি বা একজন মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হবে। এ আন্দোলন মূলত ব্যক্তি নয়, রাজনীতির ভাষার সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি রাষ্ট্রক্ষমতার এই সূক্ষ্ম দিকটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্যের ধারণা দিয়েছেন। তার মতে, কোনো শাসকগোষ্ঠী কেবল পুলিশ, আদালত বা প্রশাসনিক শক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না। টেকসই শাসনের জন্য প্রয়োজন মানুষের সম্মতি, যা তৈরি হয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং রাজনৈতিক ভাষার মাধ্যমে। মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র তার প্রতিনিধিত্ব করছে, তার অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং তার কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখনই সেই রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
গ্রামশি এ সম্মতিকেই consent বলেছেন, আর রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগকে বলেছেন coercion। সফল রাষ্ট্র এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু যখন সম্মতির জায়গা সংকুচিত হতে থাকে, তখন রাষ্ট্র ক্রমশ ভাষার বদলে নির্দেশে, যুক্তির বদলে ক্ষমতায় এবং সংলাপের বদলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যায়। তখন সংকট আর কেবল নীতির থাকে না, সংকট হয়ে ওঠে ভাষার।
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনের দিকে তাকালে এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত বা ভিন্নমত হওয়া যেতে পারে। কিন্তু তারা যে বিষয়টি সবচেয়ে প্রবলভাবে সামনে এনেছে, সেটা হলো–তাদের কথা শোনা হচ্ছে কি না। প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও কেন প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে, তার উত্তর এখানেই নিহিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সংকটের সময়ে সহমর্মিতাপূর্ণ ভাষা পরিস্থিতিকে শান্ত করেছে, আবার অবজ্ঞাসূচক বা আত্মরক্ষামূলক ভাষা ক্ষোভকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এখানেই গ্রামশির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা common sense আলোচনায় আসে। মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা এবং নৈতিক অনুভূতির সমষ্টিই গড়ে তোলে এই ‘কমন সেন্স’। কোনো রাষ্ট্র যদি এমন ভাষা ব্যবহার করে, যা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে সেই ভাষা আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। রাষ্ট্র তখন আনুষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল হতে শুরু করে।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা এমন এক সময়ে বড় হয়েছে, যখন তথ্যপ্রবাহ অভূতপূর্বভাবে উন্মুক্ত। তারা শুধু সরকারি বক্তব্যই শোনে না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, গবেষণা এবং নাগরিক আলোচনার মধ্য দিয়েও নিজেদের মতামত গড়ে তোলে। ফলে একমুখী রাজনৈতিক ভাষা বা প্রচলিত ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করা আগের তুলনায় অনেক কঠিন। এ বাস্তবতায় রাষ্ট্র যদি পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে, তবে তা দ্রুত অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
আজকের শিক্ষার্থী আন্দোলন সেই বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ বহন করছে। এটা কেবল একটি নীতিগত মতবিরোধ নয়, বরং রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাঙনের ইঙ্গিত। যখন একটি প্রজন্ম বারবার অনুভব করে যে তাদের অভিজ্ঞতাকে ছোট করে দেখা হচ্ছে, তাদের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কিংবা তাদের প্রশ্নের জবাবে সংলাপের পরিবর্তে ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন ক্ষোভ ধীরে ধীরে সংগঠিত প্রতিবাদে রূপ নেয়।
এ কারণেই বর্তমান আন্দোলনকে কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি মন্ত্রণালয়ের সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ব্যক্তি বদলানো তুলনামূলক সহজ, কিন্তু রাজনৈতিক ভাষা বদলানো অনেক কঠিন। কারণ ভাষা বদলাতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাতে হয়, ক্ষমতার সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হয়, এবং সবচেয়ে বড় কথা মানুষকে শাসনের বিষয় হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হয়।
গ্রামশি এক জায়গায় লিখেছিলেন, পুরোনো পৃথিবী যখন মরছে আর নতুন পৃথিবী তখনো জন্ম নেয়নি, তখনই সংকটের সময় উপস্থিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনও হয়তো সেই অন্তর্বর্তী সময়ের একটি প্রতিফলন, যেখানে পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা আর আগের মতো কার্যকর নয়, কিন্তু নতুন ভাষার রূপরেখাও এখনো সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি।
বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে বোঝার ক্ষেত্রে গ্রামশির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো সিভিল সোসাইটি। রাষ্ট্র কেবল সরকার, মন্ত্রণালয়, আদালত বা প্রশাসনের সমষ্টি নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সংগঠনের মধ্যদিয়ে। এই বিস্তৃত ক্ষেত্রটিই গ্রামশির ভাষায় সিভিল সোসাইটি। এখানেই তৈরি হয় মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের ধারণা।
বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে এই প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা শুধু একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করছে–এমন ব্যাখ্যা বাস্তবতার একটি অংশ মাত্র। বৃহত্তর প্রশ্ন হলো, তারা কেন রাষ্ট্রীয় ব্যাখ্যার ওপর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না? কেন প্রতিটি সরকারি বক্তব্যের বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা বয়ান গড়ে উঠছে? কেন একটি মন্তব্য, একটি বাক্য বা একটি সাক্ষাৎকারও আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিতে পারছে? এর উত্তর ব্যক্তি নয়, ভাষার মধ্যেই নিহিত।
গ্রামশি বলেছেন, শাসকগোষ্ঠী তখনই সফল হয়, যখন তার ভাষা জনগণের ‘কমন সেন্স’-এর অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ মানুষ রাষ্ট্রের বক্তব্যকে নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে সত্য বলে গ্রহণ করে। কিন্তু যখন সেই ভাষা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তখন হেজিমনি দুর্বল হতে শুরু করে। রাষ্ট্র তখনো প্রশাসনিকভাবে শক্তিশালী থাকতে পারে, কিন্তু নৈতিক নেতৃত্ব হারাতে থাকে।
এখানেই consent এবং coercion-এর প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সম্মতির জায়গা সংকুচিত হলে রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ থাকে। প্রথম পথ–আরও বেশি সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। দ্বিতীয় পথ–বলপ্রয়োগ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা কঠোর ভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। ইতিহাস বলে, দ্বিতীয় পথ হয়তো সাময়িক স্থিতি আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট আরও গভীর করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান শিক্ষার্থী আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো–নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে রাজনৈতিক জবাবদিহিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করতে চায়। এই প্রবণতাকে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। এটা একটি প্রজন্মগত পরিবর্তনের লক্ষণ।
অতএব, বর্তমান সংকটের সমাধান কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক ভাষার পুনর্গঠন। এমন একটি ভাষা, যেখানে নাগরিককে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখা হবে, যেখানে প্রশ্নকে অবাধ্যতা নয়, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ হিসেবে গ্রহণ করা হবে, যেখানে সংকটের মুহূর্তে আত্মরক্ষামূলক বক্তব্যের পরিবর্তে সহমর্মিতা ও দায়বদ্ধতা প্রকাশ পাবে।
এটা কোনো এক সরকার, কোনো এক রাজনৈতিক দল বা কোনো এক শিক্ষামন্ত্রীর জন্যই কেবল প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসে প্রায় সব সরকারই কোনো না কোনো সময়ে এই একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। ফলে বিষয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন।
আজকের শিক্ষার্থীরা হয়তো একটি নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে রাজপথে নেমেছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি রাষ্ট্রকে আরও বড় একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে–বাংলাদেশের রাজনীতি কি এমন একটি নতুন ভাষা নির্মাণ করতে পারবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বিশ্বাস, নির্দেশের চেয়ে সংলাপ এবং আধিপত্যের চেয়ে অংশগ্রহণ বেশি গুরুত্ব পাবে?
লেখক: কথাসাহিত্যিক
.jpg)
