ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
বাংলাদেশ কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের জন্য নয়: মির্জা ফখরুল স্পিডবোট রক্ষণাবেক্ষণের সময় নদীতে পড়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি নিখোঁজ প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতের বৈঠক চেক প্রতারণার মামলায় সালমান এফ রহমানের জামিন স্বাস্থ্যসেবার দাবিতে হাঁটু পানিতে নিঝুমদ্বীপবাসী ৫০০ শিক্ষাবৃত্তি দেবে সৌদি আরব: মাহাদী আমীন বগুড়ায় উৎসবমুখর পরিবেশে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত নতুন উপজেলা ও পৌরসভার দাবিতে শৈলকুপায় মানববন্ধন গুগল পিক্সেল ওয়াচের ছবি ফাঁস ব্রিডিং গ্রাউন্ডের অফলাইন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ময়মনসিংহ মেডিকেলে দালালবিরোধী অভিযান, আটক ১৪ তরুণদের দক্ষতায় বদলে যাবে আগামীর বাংলাদেশ জয়ধ্বনি আর উচ্ছ্বাসে মানিকগঞ্জে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা দুর্নীতির মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহন সিসা দূষণে ঝুঁকিতে কোটি কোটি শিশু, কার্যকর পদক্ষেপের দাবি রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত শহিদ আবু সাঈদের স্মরণসভায় অর্ধেক চেয়ার খালি, হতাশ মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী সুশাসনের সঙ্গে টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা জরুরি হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু রক্ষক যখন ভক্ষক সংগঠন অধ্যায়ের ১৫টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা ২য় পত্র জাহাঙ্গীর হত্যায় ‘ভাড়াটে খুনি’ গ্রেপ্তার, পুলিশের দাবি ঢাকা থেকে আনা হয়েছিল আমি কখনো প্রেম করিনি: দীঘি ব্রাজিলের পরবর্তী সুপারস্টার কে এই কাওয়ান বাসিলে ? নতুন প্রেমে শেহনাজ! মেসির কোলে শিশু ইয়ামাল, ভাইরাল ছবি কি সত্য গল্প? আখাউড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির মৃত্যু নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডে ৫.৬২ মাত্রার ভূমিকম্প নরসিংদীতে পানিতে ডুবে ৪ শিশুর মৃত্যু আবহাওয়ার উন্নতি, বান্দরবানে উন্মুক্ত পর্যটনকেন্দ্র

রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত
শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।...

আষাঢ়ের বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে যখন লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি, তখন বোঝা যায়, এ কেবল একটি উৎসব নয়, এ এক জাতির হৃদয়ের স্পন্দন। শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রতি বছর নতুন করে প্রমাণ করে দেয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠানও কীভাবে মানুষে মানুষে মিলনের বন্ধন তৈরি করতে পারে।

উৎসবের সূচনা ও তাৎপর্য: আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ওড়িশার পুরীধামে শুরু হয় এই মহাযাত্রা। জগন্নাথদেব, বলদেব ও সুভদ্রা–এই তিন বিগ্রহ কাঠ নির্মিত তিনটি সুবিশাল রথে চড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আসেন জনসমুদ্রের মাঝে। প্রতি বছর নতুন কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এই রথ, আর তা টেনে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য পান হাজার হাজার ভক্ত। এই দৃশ্য যেন এক জীবন্ত ছবি, যেখানে ভগবান নিজেই মন্দিরের বদ্ধ প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে চলে আসেন।

সাধারণত মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা নিয়মকানুন থাকে, কিন্তু রথযাত্রার দিনগুলোতে সে সীমাবদ্ধতা থাকে না। রাজপথই তখন হয়ে ওঠে দর্শনের স্থান। এখানেই এই উৎসবের গভীরতম বার্তা লুকিয়ে আছে–ভগবান কারও জন্য অপেক্ষা করেন না, বরং নিজেই এগিয়ে আসেন সবার কাছে, বিনা ভেদাভেদে।

সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত: রথযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে কোনো জাত-পাতের বাছবিচার নেই। ধনী-গরিব, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষও একসঙ্গে রথের রশি ধরে টানতে পারেন। এই দৃশ্য সমাজের বুকে সাম্যের এক জীবন্ত পাঠ তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিকটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। রথযাত্রার দিন প্রায়ই দেখা যায়, জাতি-ধর্মনির্বিশেষে মানুষ উৎসাহ নিয়ে রথের যাত্রাপথে ভিড় জমান, স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশে রথযাত্রার ঐতিহ্য: বাংলাদেশে রথযাত্রার ইতিহাস বেশ পুরোনো ও সমৃদ্ধ। ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের রথযাত্রা এ দেশে সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় আয়োজনগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের ৬৪টি জেলাতেই ইসকনসহ বিভিন্ন সনাতনী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় রথযাত্রা পালিত হয়ে থাকে। প্রতি বছর এ আয়োজনের ব্যাপ্তি বাড়ছে, যা প্রমাণ করে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে এই ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর।

বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতি: ১৯৬৭ সালে শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রথম রথযাত্রা আয়োজন করে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তোলেন। তার সেই প্রচেষ্টার ফল আজ দৃশ্যমান লন্ডন, নিউইয়র্ক, মস্কো, বার্লিন থেকে শুরু করে পৃথিবীর অসংখ্য শহরে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ যখন একই কীর্তনের সুরে রথের রশি টানেন, তখন তা প্রমাণ করে দেয় যে ভক্তি ও প্রেমের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।

জয় জগন্নাথ!

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসকন বাংলাদেশ

রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম
রথযাত্রা: ভালোবাসা ও সম্প্রীতির এক অবিরাম স্রোত
শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।...

আষাঢ়ের বৃষ্টিভেজা আকাশের নিচে যখন লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি, তখন বোঝা যায়, এ কেবল একটি উৎসব নয়, এ এক জাতির হৃদয়ের স্পন্দন। শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা প্রতি বছর নতুন করে প্রমাণ করে দেয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠানও কীভাবে মানুষে মানুষে মিলনের বন্ধন তৈরি করতে পারে।

উৎসবের সূচনা ও তাৎপর্য: আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ওড়িশার পুরীধামে শুরু হয় এই মহাযাত্রা। জগন্নাথদেব, বলদেব ও সুভদ্রা–এই তিন বিগ্রহ কাঠ নির্মিত তিনটি সুবিশাল রথে চড়ে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে আসেন জনসমুদ্রের মাঝে। প্রতি বছর নতুন কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এই রথ, আর তা টেনে নিয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য পান হাজার হাজার ভক্ত। এই দৃশ্য যেন এক জীবন্ত ছবি, যেখানে ভগবান নিজেই মন্দিরের বদ্ধ প্রাচীর ভেঙে সাধারণ মানুষের কাছে চলে আসেন।

সাধারণত মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা নিয়মকানুন থাকে, কিন্তু রথযাত্রার দিনগুলোতে সে সীমাবদ্ধতা থাকে না। রাজপথই তখন হয়ে ওঠে দর্শনের স্থান। এখানেই এই উৎসবের গভীরতম বার্তা লুকিয়ে আছে–ভগবান কারও জন্য অপেক্ষা করেন না, বরং নিজেই এগিয়ে আসেন সবার কাছে, বিনা ভেদাভেদে।

সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত: রথযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে কোনো জাত-পাতের বাছবিচার নেই। ধনী-গরিব, ব্রাহ্মণ-শূদ্র, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষও একসঙ্গে রথের রশি ধরে টানতে পারেন। এই দৃশ্য সমাজের বুকে সাম্যের এক জীবন্ত পাঠ তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিকটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। রথযাত্রার দিন প্রায়ই দেখা যায়, জাতি-ধর্মনির্বিশেষে মানুষ উৎসাহ নিয়ে রথের যাত্রাপথে ভিড় জমান, স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে।

বাংলাদেশে রথযাত্রার ঐতিহ্য: বাংলাদেশে রথযাত্রার ইতিহাস বেশ পুরোনো ও সমৃদ্ধ। ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের রথযাত্রা এ দেশে সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় আয়োজনগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের ৬৪টি জেলাতেই ইসকনসহ বিভিন্ন সনাতনী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় রথযাত্রা পালিত হয়ে থাকে। প্রতি বছর এ আয়োজনের ব্যাপ্তি বাড়ছে, যা প্রমাণ করে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে এই ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর।

বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতি: ১৯৬৭ সালে শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে প্রথম রথযাত্রা আয়োজন করে এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তোলেন। তার সেই প্রচেষ্টার ফল আজ দৃশ্যমান লন্ডন, নিউইয়র্ক, মস্কো, বার্লিন থেকে শুরু করে পৃথিবীর অসংখ্য শহরে। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ যখন একই কীর্তনের সুরে রথের রশি টানেন, তখন তা প্রমাণ করে দেয় যে ভক্তি ও প্রেমের কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।

রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবতার প্রতি এক আহ্বান–ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে পথ চলার আহ্বান। বাংলাদেশের মতো বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশে এই উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারে। আসুন, আমরা সবাই এই পবিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সমাজে প্রেম, সাম্য ও সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিই।

জয় জগন্নাথ!

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ইসকন বাংলাদেশ

পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত
ডা. ইকবাল আনোয়ার, লেখক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সাবেক সভাপতি, বিএমএ, কুমিল্লা

সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এ কেন্দ্রে গিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে, যা তাদের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেহেতু বিষয়টি সামনে চলে এসেছে: তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা; পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। তার চেয়েও সহজ উপায় আমার কাছে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো বর্ষাকালের পরিবর্তে শুষ্ক মৌসুমে নেওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই চিন্তাভাবনার মধ্যে রাখা উচিত ছিল। আশা রাখছি সামনে এমনটিই হবে।

এখন এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখছি বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের কারণে আমাদের আগামী প্রজন্মের কিশোর তরুণরা ক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিচ্ছে; এমনকি মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে।

তাদের এ গণতান্ত্রিক চর্চা কোনো অসুস্থ আচরণ নয়; তবে তাদের মুখের ভাষা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চোখ রাঙানোসহ আরও অনেক কিছু এই কিশোর বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়; তেমনভাবে ধমকের সুরে কথা বলা কাম্য নয়। আমি মনে করি, পানির মধ্যে বসে পরীক্ষা দেওয়ার চাইতেও তাদের মনে কষ্ট লেগেছে মন্ত্রীর একটি উক্তি। উক্তিটি ম্যাচের শলাকার মতো কাজ করেছে।

এমনকি তারা অতীতের একটি বন্দোবস্তের নমুনায় ‘তুমি কে আমি কে’ বলে ওই উক্তিটি প্রতিস্থাপন করছে আগের উক্তিটির বদলে, এর মাধ্যমে কি তারা কোনো কিছু অর্জন করতে চায়? এই বিষয়টি নিয়ে কি ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কেউ ঢুকে পড়েছে?

এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের আরেকটি অভিযোগ আমার কানে এসেছে–সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার দুটি প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মতে সিলেবাসের বাইরে থেকে এসেছে। মুক্তচিন্তা এবং সৃজনশীলতার বাতাবরণে আমরা যখন চিন্তা করছি; তখন ‘সিলেবাসের বাইরে’ বলতে কী বোঝায়–এ নিয়ে প্রশ্ন রাখা যায়। প্রশ্ন কমন না পড়লেই তা সিলেবাসের বাইরে এমনটা বলাও যুক্তিযুক্ত নয়। আর যদি প্রশ্নটি সত্যিই সিলেবাসের বাইরে হয়ে থাকে বা প্রশ্নের বক্তব্যের ভুলে তা অস্পষ্টতা ও অর্থহীনতার বেড়াজালে আক্রান্ত একটি প্রশ্ন হয়, তাহলে অবশ্যই এটি নিন্দনীয়। আমরা জানি যে প্রশ্ন করার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ও মডারেটর থাকেন এবং এটাকে বারবার মূল্যায়ন করা হয়। এ প্রসঙ্গে যারা এ জন্য  দায়ী, তদন্ত করে তাদের অবশ্যই যথাযথ বিচার করতে হবে। কারণ দেশের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কোনোভাবেই গাফিলতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এটি জাতি গঠনের সঙ্গে জড়িত। সামগ্রিক বিষয়টি মূল্যায়ন করে এর অতিসত্বর সমাধান জরুরি। আমাদের শিশুরা বিবেকবান; তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দিলে সহজেই নমনীয় হতে দেখেছি।

এমনিতেই আমাদের দেশে কিশোর-তরুণদের উপযুক্ত নার্সিং করা যাচ্ছে না। বিশ্বের যেসব দেশ উন্নতি করেছে, তারা তাদের সবচেয়ে প্রধান বিনিয়োগ, সবচেয়ে সুন্দর সম্ভাষণ, সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা, সুনজর, সু-সেবা দিয়েছে তাদের শিশু-কিশোরদের।

কিশোর-তরুণদের মনে আশার আলো জ্বালাতে হবে। তাদের পজিটিভ মটিভেশনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মনস্তত্ব বুঝে তাদের বুকে টেনে নিতে হবে। তারা কচি মনের। তাদের আবেগ বেশি। তাদের রক্ত চঞ্চল। তাদের যা ইচ্ছা তা বলা যায় না, যাবে না। তারা অভিমানী। এমনিতেই তারা ভেতরে ভেতরে নীরব কান্না বুকে পুষে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলে।

শিশু চিকিৎসক হিসেবে তাদের চোখে তাকিয়ে আমি পড়তে চেষ্টা করি। সেখানে  হাসি, স্বতঃস্ফূর্ততা আমি দেখি না। সংসদে তাদের নিয়ে কথা তেমন হতে দেখি না। তাদের মধ্যে বহু শিশু-কিশোর-তরুণ ডিপ্রেশনের রোগী। তারা অনেকে আছে, ভেতরে জ্বলছে, বাইরে ধীর থাকতে মনকে কোনো রকম শাসিয়ে রাখছে। বড়রা দুর্নীতি করে, শিশু-কিশোররা এর জন্য  দায়ী নয়, তবু তাদের ভুগতে হয় সবচেয়ে বেশি। প্রথমে সবচে বড় ধাক্কাটা লাগে তাদের গায়ে।

তাদের বাড়ন্ত দেহ। তারা বিষযুক্ত খাদ্য খেতে বাধ্য হয়। কিছুদিন পরপর তাদের ওপর দিয়ে নানা গবেষণা–এভাবে নয়, ওভাবে! নানা রকম পরিবর্তন, নানা পদ্ধতি! এমনকি তাদের বইয়ের বিষয়, বিশ্বাস এবং ইতিহাসও বদলে যায়। অসম ব্যবস্থায় তারা ‘মন খারাপের সময়’ পার করে।

একদম না বোঝা বয়সে শিশুরা হাসে, ছোটাছুটি করে। তারা বড় হলেই তো এ হাসিটা আর হাসতে পারবে না। তারা দেখবে একটা দরিদ্র দেশ। তার চেয়ে বেশি দেখবে একটা দুর্নীতির দেশ। মারামারির দেশ। দেখবে, যারা দুর্নীতি করে তাদেরই পোয়াবারো। দেখবে, স্কুল-কলেজসহ সবখানে দ্বিচারিতা। তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কী ভাষা ব্যবহার করতে হবে, তা না জেনে, মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলা উচিত না। তারাই আমাদের সম্পদ।

একজন শিক্ষার্থীর বাবা 

এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা
জিয়াউল কবির দুলু, সভাপতি, অভিভাবক ঐক্য ফোরাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রদলকে যেতে দেখলাম। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের সেভাবে দেখিনি। এই ভিড়ের মধ্যে আমি শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের খুঁজেছি। বোর্ড চেয়ারম্যানদেরও খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও দেখতে পাইনি। সোমবার (১৩ জুলাই) সরকারের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। আর কাদের ফার্মের মুরগি বলা হলো। তারা কাদের সন্তান? আমাদেরই তো। বাচ্চাদের এভাবে বললে আমাদের খারাপ লাগে। বাচ্চাদের মধ্যেও এ মন্তব্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ভুল হয়। এই ঘটনায় চার শিক্ষককে কারণ দর্শানো হয়। কিন্তু ভুল প্রশ্ন কেন? এই সময়ে এটাও সম্ভব! প্রশ্ন সংশোধন-পরিমার্জনের দায়িত্বে যারা ছিলেন এটা তাদের চরম গাফিলতির প্রমাণ। গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা রয়েছেন তাদের কাছ থেকে এমন দায়িত্বহীন আচরণ মোটেও কাম্য নয়। অতীতেও প্রশ্নপত্রে ভুলের ঘটনা আমরা দেখেছি। অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠা শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

সভাপতি, অভিভাবক ঐক্য ফোরাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা

করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ এএম
করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে
আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার, সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা কলেজ

করোনার সময় থেকেই শিক্ষাব্যবস্থায় ক্রান্তিকাল চলছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রভাব ক্লাসরুমেও পড়েছে। করোনার পর থেকে সে ভাবে লেখাপড়াই হয়নি। এর জন্য একটি বড় কারণ শিক্ষকসংকট। আমি দেখছি মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে ১ লাখ শিক্ষক পদ খালি। এগুলো তো পূরণের উদ্যোগ দেখছি না। আবার প্রাথমিকে ৩৫ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ খালি। একটি প্রতিষ্ঠানে প্রধান না থাকলে সেখানে লেখাপড়া হয় না। আমি ঢাকা কলেজে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেছি। সেখানে এক দিন না গেলেই খবর পেয়েছি ক্লাস হয়নি। আমার মনেও প্রশ্ন ওঠে-প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে কীভাবে? পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থীকে বলতে শুনলাম, এসব বিষয় তো শিক্ষক আমাকে পড়াননি, আমি উত্তর দেব কীভাবে। এ ঘটনা তো সত্যি। এসব কলেজের কমিটিপ্রধান ইউএনওরা। তারা কী জবাব দিতে পারবেন? তবে এই আন্দোলনে কোচিং সেন্টারের ইন্ধন থাকবে, আমার অভিজ্ঞতা এটাই বলে।

সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা কলেজ 

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে ছিদ্র রয়ে গেছে

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ এএম
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে ছিদ্র রয়ে গেছে
মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলাকালে চলা এই আন্দোলন শুধুই আন্দোলন নয়। আমি মনে করি, এটি বড় রোগের একটি ছোট লক্ষণ। দীর্ঘদিন যে আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে যত্ন নেইনি, এটি তার ছোট্ট লক্ষণ। আরেকটি সমস্যা হলো শিক্ষা প্রশাসনের দুর্বলতা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এখন শূন্যরেখায় অবস্থান করছে। এই ব্যবস্থায় অনেক ছিদ্র রয়ে গেছে, যার মেরামত এখনও শুরু হয়নি। বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল শিক্ষা কমিশন গঠন করবে। ক্ষমতায় আসার ৫ মাস পরও এ বিষয়ে উদ্যোগ দেখা যায়নি। মন্ত্রীরা কেউ স্মার্ট বোর্ড, ট্যাব ও তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলকের কথা বলছেন। এগুলো তাদের কাছে কে চেয়েছে? আমাদের শিক্ষক সংকট রয়েছে। যারা আছেন, তারা কতটা মানসম্পন্ন? সত্যি কথা বলতে শিক্ষায় কোনো সমন্বয় নেই। জগাখিচুড়ির মধ্যে চলছে।

মন্ত্রণালয় বলছে, ডিসি-এসপিদের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা চালিয়ে গেছে। এই যে দায় চাপানোর সংস্কৃতি। তাহলে কতজন এসপি-ডিসিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই সংকট তো তাদের জন্যই। মন্ত্রী বলছেন, পদার্থবিজ্ঞান আগের সরকারের প্রশ্নপত্র। তবে আপনি এ কয় মাস কী করলেন? সরকার বলছে, পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া হতে পারে। মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশটাও দায়সারা। এমন হলে এ আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। আমি মনে করি, সরকারকে এই জেনারেশন রিড করতে হবে। সরকারকে সমস্যা সমাধান করে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। এটি যত দেরি হবে সংকট তত বাড়বে।

অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়