সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এ কেন্দ্রে গিয়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে, যা তাদের শরীর ও মনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেহেতু বিষয়টি সামনে চলে এসেছে: তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা; পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। তার চেয়েও সহজ উপায় আমার কাছে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো বর্ষাকালের পরিবর্তে শুষ্ক মৌসুমে নেওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই চিন্তাভাবনার মধ্যে রাখা উচিত ছিল। আশা রাখছি সামনে এমনটিই হবে।
এখন এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখছি বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা গ্রহণের কারণে আমাদের আগামী প্রজন্মের কিশোর তরুণরা ক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিচ্ছে; এমনকি মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে।
তাদের এ গণতান্ত্রিক চর্চা কোনো অসুস্থ আচরণ নয়; তবে তাদের মুখের ভাষা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চোখ রাঙানোসহ আরও অনেক কিছু এই কিশোর বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়; তেমনভাবে ধমকের সুরে কথা বলা কাম্য নয়। আমি মনে করি, পানির মধ্যে বসে পরীক্ষা দেওয়ার চাইতেও তাদের মনে কষ্ট লেগেছে মন্ত্রীর একটি উক্তি। উক্তিটি ম্যাচের শলাকার মতো কাজ করেছে।
এমনকি তারা অতীতের একটি বন্দোবস্তের নমুনায় ‘তুমি কে আমি কে’ বলে ওই উক্তিটি প্রতিস্থাপন করছে আগের উক্তিটির বদলে, এর মাধ্যমে কি তারা কোনো কিছু অর্জন করতে চায়? এই বিষয়টি নিয়ে কি ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে কেউ ঢুকে পড়েছে?
এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের আরেকটি অভিযোগ আমার কানে এসেছে–সম্ভবত পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার দুটি প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মতে সিলেবাসের বাইরে থেকে এসেছে। মুক্তচিন্তা এবং সৃজনশীলতার বাতাবরণে আমরা যখন চিন্তা করছি; তখন ‘সিলেবাসের বাইরে’ বলতে কী বোঝায়–এ নিয়ে প্রশ্ন রাখা যায়। প্রশ্ন কমন না পড়লেই তা সিলেবাসের বাইরে এমনটা বলাও যুক্তিযুক্ত নয়। আর যদি প্রশ্নটি সত্যিই সিলেবাসের বাইরে হয়ে থাকে বা প্রশ্নের বক্তব্যের ভুলে তা অস্পষ্টতা ও অর্থহীনতার বেড়াজালে আক্রান্ত একটি প্রশ্ন হয়, তাহলে অবশ্যই এটি নিন্দনীয়। আমরা জানি যে প্রশ্ন করার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ও মডারেটর থাকেন এবং এটাকে বারবার মূল্যায়ন করা হয়। এ প্রসঙ্গে যারা এ জন্য দায়ী, তদন্ত করে তাদের অবশ্যই যথাযথ বিচার করতে হবে। কারণ দেশের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় কোনোভাবেই গাফিলতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এটি জাতি গঠনের সঙ্গে জড়িত। সামগ্রিক বিষয়টি মূল্যায়ন করে এর অতিসত্বর সমাধান জরুরি। আমাদের শিশুরা বিবেকবান; তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দিলে সহজেই নমনীয় হতে দেখেছি।
এমনিতেই আমাদের দেশে কিশোর-তরুণদের উপযুক্ত নার্সিং করা যাচ্ছে না। বিশ্বের যেসব দেশ উন্নতি করেছে, তারা তাদের সবচেয়ে প্রধান বিনিয়োগ, সবচেয়ে সুন্দর সম্ভাষণ, সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসা, সুনজর, সু-সেবা দিয়েছে তাদের শিশু-কিশোরদের।
কিশোর-তরুণদের মনে আশার আলো জ্বালাতে হবে। তাদের পজিটিভ মটিভেশনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মনস্তত্ব বুঝে তাদের বুকে টেনে নিতে হবে। তারা কচি মনের। তাদের আবেগ বেশি। তাদের রক্ত চঞ্চল। তাদের যা ইচ্ছা তা বলা যায় না, যাবে না। তারা অভিমানী। এমনিতেই তারা ভেতরে ভেতরে নীরব কান্না বুকে পুষে, পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলে।
শিশু চিকিৎসক হিসেবে তাদের চোখে তাকিয়ে আমি পড়তে চেষ্টা করি। সেখানে হাসি, স্বতঃস্ফূর্ততা আমি দেখি না। সংসদে তাদের নিয়ে কথা তেমন হতে দেখি না। তাদের মধ্যে বহু শিশু-কিশোর-তরুণ ডিপ্রেশনের রোগী। তারা অনেকে আছে, ভেতরে জ্বলছে, বাইরে ধীর থাকতে মনকে কোনো রকম শাসিয়ে রাখছে। বড়রা দুর্নীতি করে, শিশু-কিশোররা এর জন্য দায়ী নয়, তবু তাদের ভুগতে হয় সবচেয়ে বেশি। প্রথমে সবচে বড় ধাক্কাটা লাগে তাদের গায়ে।
তাদের বাড়ন্ত দেহ। তারা বিষযুক্ত খাদ্য খেতে বাধ্য হয়। কিছুদিন পরপর তাদের ওপর দিয়ে নানা গবেষণা–এভাবে নয়, ওভাবে! নানা রকম পরিবর্তন, নানা পদ্ধতি! এমনকি তাদের বইয়ের বিষয়, বিশ্বাস এবং ইতিহাসও বদলে যায়। অসম ব্যবস্থায় তারা ‘মন খারাপের সময়’ পার করে।
একদম না বোঝা বয়সে শিশুরা হাসে, ছোটাছুটি করে। তারা বড় হলেই তো এ হাসিটা আর হাসতে পারবে না। তারা দেখবে একটা দরিদ্র দেশ। তার চেয়ে বেশি দেখবে একটা দুর্নীতির দেশ। মারামারির দেশ। দেখবে, যারা দুর্নীতি করে তাদেরই পোয়াবারো। দেখবে, স্কুল-কলেজসহ সবখানে দ্বিচারিতা। তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কী ভাষা ব্যবহার করতে হবে, তা না জেনে, মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলা উচিত না। তারাই আমাদের সম্পদ।
একজন শিক্ষার্থীর বাবা

