ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতি টানতে নতুন কৌশল খুঁজছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (১৩ জুলাই) হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র এক দিন পরই তিনি সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ আরও বিস্তৃত না করে সংকটের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে ওয়াশিংটন।
সোমবার (১৩ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা ব্যয়ের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এ নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে পরদিন মঙ্গলবার নিজের অবস্থান বদলান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির প্রস্তাব দেন। ইঙ্গিত দেন, যারা এ চুক্তিতে যুক্ত হবে, তাদের হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচলে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমন নীতিগত পরিবর্তন ইঙ্গিত করে, ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পথ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত থামাতে মাসখানেক আগে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। এর মাধ্যমে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং শান্তি আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু কয়েক দফা আলোচনার পরও স্থায়ী সমাধানের অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও তাদের মিত্র দেশগুলোতে ইরানি হামলার ঝুঁকিও বেড়েছে। ফলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার বদলে বিকল্প সমাধানের পথেই হাঁটতে চাইছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প এমন একটি সমঝোতা চান, যা ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া পরমাণু চুক্তির চেয়ে ‘ভালো’ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিক বলেন, ‘সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হলো যুদ্ধের দ্রুত কোনো সমাপ্তি না হওয়া। এটি এখন হিসাব-নিকাশের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, আর এ ধরনের সংঘাত সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়।’
সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকও যুদ্ধ থামানোর নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। নতুন করে মার্কিন হামলার মধ্যেই মঙ্গলবার ট্রাম্প আবারও ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর নৌ অবরোধের ঘোষণা করেন। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়ায় ইরান। পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল আবারও ব্যাহত হয়। মাসখানেক ধরে বারবার শান্তি আলোচনা শুরু ও স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি সংঘর্ষও চলেছে। এতে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে ইরানের কিছু সক্ষমতা দুর্বল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে এখনও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের মতে, ইরান এখনও হরমুজ প্রণালিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ধরে রেখেছে। আর বড় পরিসরে সামরিক অভিযান ছাড়া সেই অবস্থান বদলানো ওয়াশিংটনের জন্য সহজ হবে না।
হরমুজ প্রণালিতে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনাও ছিল নতুন চাপ তৈরির একটি কৌশল। তবে বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ জুনে ইরান একই ধরনের প্রস্তাব দিলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারে না; এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।
কিন্তু পরে ট্রাম্প নিজেই একই ধরনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আবার তা প্রত্যাহার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে স্পষ্ট হয়েছে, ইরান সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখনও সুস্পষ্ট কোনো কৌশল নেই। তাদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করে সংঘাত বাড়ানো; অন্যদিকে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যাতে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাই ক্ষমতায় থেকে যায়।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সিনিয়র ফেলো এলিয়ট আব্রামস বলেন, ‘আমরা আবার সেই পুরোনো প্রশ্নেই ফিরে এসেছি। শেষ পর্যন্ত কার ধৈর্য বেশি থাকবে? ইরানের, নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলনির্ভর দেশগুলোর?’ সূত্র: বিবিসি