চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী। দিনের বেলায় নদীর চারপাশ নীরব থাকলেও রাত হলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। অন্ধকার নামার পর থেকে ভোর পর্যন্ত নদী থেকে দেদার বালু উত্তোলন করা হয়। সেই বালু চলে যায় ভিটা ভরাট কিংবা সড়ক সংস্কারের কাজে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হুমকির মুখে পড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় ও চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নে সাঙ্গু নদীর বিভিন্ন অংশে রাতের আঁধারে ইঞ্জিনচালিত বোটের ওপর শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় নদীর চর কেটে বালু লুট করে ডাম্প ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সরেজমিনে ধোপাছড়ি বাজার, শঙ্খরকুল, বড়খোলা, পুরানগড় নতুনহাট, শীলঘাটা, বৈতরণি, কালীনগর ও লতাবুনিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় রাতের আঁধারে সাঙ্গু নদী থেকে বালু উত্তোলন করে ভিটা ভরাটের পাশাপাশি সড়ক সংস্কারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত শ্যালো মেশিন স্থাপন করা ইঞ্জিনচালিত বোটগুলো তীরেই বেঁধে রাখা হয়েছে। আবার নদীর বেশ কয়েকটি অংশে ভেকুর সাহায্যে ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর গর্ত করে চরের বালু অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ধোপাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, ‘দিনের বেলায় মানুষ পারাপার ছাড়া নদীতে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। তবে রাত গভীর হলে ড্রেজার, শ্যালো মেশিন, ভেকু ও ডাম্প ট্রাকের আনাগোনা বেড়ে যায়। বালু ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়ার ভয়ে স্থানীয়রা কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। এ ছাড়া আমাদের ইউনিয়নটি উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।’
পুরানগড় ইউনিয়নের বৈতরণি এলাকার মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘মাঝেমধ্যে নদীর এপারে বোটের ওপর শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে ভিটা ভরাট করা হয়। তবে নদীর ওপারে প্রায় সময় রাতের আঁধারে ভেকুর সাহায্যে চর কেটে বালু লুট করা হয়। ওই সময় ভেকু ও ডাম্প ট্রাকের বিকট শব্দে ঘুমানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
দোহাজারী পৌরসভার দিয়াকুল গ্রামের যুবক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে বালু উত্তোলন চলছে। এতে নদীর তীর ভাঙনের পাশাপাশি বসতভিটাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের আশঙ্কা আরও বেড়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
স্থানীয় নদী সংরক্ষণ কর্মী নাছির উদ্দিন বলেন, নদী থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এভাবে বালু তুললে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এ ছাড়া নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নদী ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট। বালু উত্তোলনের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।’
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পাওয়ার পর গ্রামপুলিশ পাঠিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছে। ধোপাছড়ি এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সার্বক্ষণিক তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’