ঢাকা ১ শ্রাবণ ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
উত্তরায় ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল এক ব্যক্তির বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে ‘অপারেশন লাইটনিং’ ইরানের কাতারের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা হস্তান্তর করলেন স্পিকার বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরে হামলা ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে ইরান এই গোলের স্বপ্ন দেখেছি ছোটবেলা থেকেই: লাউতারো মার্তিনেস নবীগঞ্জে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে চালক নিহত হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ, ঝুঁকিতে জ্বালানি সরবরাহ আড়াইহাজারে তাঁত প্রশিক্ষণকেন্দ্র উদ্বোধন করলেন পাট প্রতিমন্ত্রী সমালোচকদের উদ্দেশ্যে যা বললেন মেসি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের হাসপাতাল-সেনা ব্যারাক ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ৮ জেলায় ঝড় ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস ফটিকছড়িতে উপজেলা সদর দপ্তরের স্থান নির্ধারণের দাবিতে হরতাল চলছে জুলাই শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ইনসাফভিত্তিক দেশ গঠনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির পাবলিক পরীক্ষা শুষ্ক মৌসুমে নেওয়া উচিত গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে এগিয়ে মেসি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে পর যা বললেন মেসি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভটভটির ধাক্কায় শিশুর মৃত্যু তিতাস নদীর তীর ভরাট করায় এনসিপি নেতাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা ইরান ইস্যুতে প্রতিরক্ষা বিল আটকালেন ডেমোক্র্যাটরা চাপের মুখেই আর্জেন্টিনা নিজেদের সেরা ফুটবল খেলে: স্কালোনি মেট্রোরেলের ৭৩০ বিয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ, পিয়ার হেডে ফাটল ইরান যুদ্ধ শেষ করতে মরিয়া ট্রাম্প প্রকল্প ব্যয় সাড়ে ১৬ বছরে বরাদ্দের ৫৬ শতাংশ খরচ আবু সাঈদ হত্যার রায়: ৫ যুক্তিতে খালাস চেয়ে ৪ আসামির আপিল আজ মিঠামইনে বিএনপি সভাপতি জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা ৮৫ ফুটের মেসি এই আন্দোলন শতভাগ প্রশাসনিক ব্যর্থতা মেজাজ হারিয়ে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কে চড় দিলেন বেলিংহাম করোনাকাল ও কোচিং সেন্টার দায়ী থাকতে পারে আল-আরাফাহ ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন

ব্যবস্থাপনার সংকটে ডুবছে ঢাকা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ এএম
ব্যবস্থাপনার সংকটে ডুবছে ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে আবারও নগর ব্যবস্থাপনার সংকট সামনে এসেছে। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি–অসংখ্য এলাকা গত শনি ও রবিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে তলিয়ে ছিল। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় পানি নামতে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও নগরজীবনে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় বিভিন্ন সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে, তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে, কোথাও আবার চুরি হয়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

রাজধানীর এই বেহাল অবস্থার জন্য শুধু অতিবৃষ্টিকে দায়ী করছেন না সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরাও। বরং তারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, খাল দখল, নদী ভরাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নগর পরিচালনায় দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতাই জলাবদ্ধতাকে ভয়াবহ করে তুলেছে। যদিও সমস্যা চিহ্নিত হলেও সমাধানে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো করেননি। 

এর আগে গত শুক্র-শনি-রবিবারের টানা বৃষ্টিতে হাজারও পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদেরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল পানিতে বিকল হয়ে পড়ে।

এসব বিষয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক সেমিনারে রাজধানীর জলাবদ্ধতার কারণ ও নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে রাজধানীর জলাবদ্ধতার দুটি প্রধান কারণ উঠে আসে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাল-নদী দখল। জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ঢাকার প্রাকৃতিক খাল দখল ও ভরাট হওয়ার কারণেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যেসব খাল এখনো টিকে আছে, সেগুলো উদ্ধার, পরিষ্কার এবং নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। 

মন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘তুরাগ নিয়মিতভাবে দখলের শিকার হয়েছে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ দখলমুক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। এই নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে ঢাকা শহরকেও রক্ষা করা সম্ভব হবে না!’ 

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যে দীর্ঘদিন থাকা সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বয়হীনতার সংকট রয়েছে। তার ভাষায়, সিটি করপোরেশনগুলোকে আরও স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সময়ের দাবি। রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশসহ নগর উন্নয়নে নিয়োজিত সব সংস্থাকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় না আনলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো সাময়িক বা মৌসুমি সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজব্যবস্থা এবং অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলই এখন প্রতি বর্ষায় ভয়াবহ আকারে দেখা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একসময়ে রাজধানীর বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার। কিন্তু দখল ও ভরাটের কারণে অধিকাংশ খাল স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। কোথাও খাল সংকুচিত হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ও পলিতে ভরে গেছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টানা জলাবদ্ধতায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক সড়কের কার্পেটিং উঠে খোয়া ছড়িয়ে পড়েছে এবং ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

বাড্ডা লিংক রোডের একটি অংশ ধসে লেকে পড়ে গেছে। এ ছাড়া নিকেতন, মহানগর প্রজেক্ট, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, হাতিরপুল, রাজাবাজার, মীরবাগ, বংশাল, কদমতলীর পাটেরবাগ ও কোদারবাজার এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা অংশের সার্ভিস রোডও দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকার ধোলাইখালসংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে ওয়াসার পুরোনো পানির পাইপ ফেটে মাটি সরে যাওয়ায় সড়কের একটি অংশ ধসে পড়েছে। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

জলাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজধানীতে খোলা ম্যানহোলও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, রাজধানীর অসখ্য ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে। আবার কোথাও রাস্তা ভেঙে পড়ায় ম্যানহোলের ঢাকনা সহজে আলাদা হয়ে থাকছে, তা রিকশা-সিএনজিচালিত অটোচালকরা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এর আগে গত রবিবার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যায়। ওই সময় খোলা ম্যানহোলে এক পথচারী পানির স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার ধানমন্ডি, পান্থপথ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পুরান ঢাকার একাধিক এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা ছিল না–খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজব্যবস্থা চালু এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করার পাশাপাশি রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও অন্য সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকার নদী, খাল ও জলাশয়ের দখলদারদের তালিকা অনেক আগেই নদী রক্ষা কমিশন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের সহযোগী এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু বক্তব্য নয়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ইটিপি ছাড়া পরিচালিত কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীতীরের অননুমোদিত শিল্পকারখানা নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা জরুরি।

ড. আদিলের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে খাল-নদী দখল ও দূষণ বন্ধ হবে না। এর ফলে ঢাকার বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ১ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কিনতে ব্যয় হয় ৮ কোটি, লোপাট ৭ কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
বাংলাদেশ রেলওয়ের ১ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কিনতে ব্যয় হয় ৮ কোটি, লোপাট ৭ কোটি টাকা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন স্পেয়ার পার্টস কেনাকাটায় ৭ কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। রেলের যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় এই অনিয়মের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে তৎপর হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, রেলের এসব যন্ত্রাংশের বাজারমূল্য ছিল ১ কোটি টাকা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও রেলের অসাধু কর্মকর্তারা সেসব যন্ত্রাংশ কিনতে ৮ কোটি টাকা বিল উঠিয়ে নিয়েছেন। অতিরিক্ত ৭ কোটি টাকা এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই কেনাকাটায় প্রধান ভূমিকা পালন করে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। তাই এই কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নজরদারিতে রেখেছে দুদক। রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কাছে যন্ত্রাংশ কেনাকাটাসংক্রান্ত সব নথি চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক। 

গত ২১ জুন দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব নথিপত্র চেয়ে পাঠানো হয়েছে। নথি জমা দেওয়ার জন্য আগামী ২২ জুলাই পর্যন্ত রেলওয়েকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ চিঠি খবরের কাগজের হাতে এসেছে।

দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈদ্যুতিক বিভাগের জন্য ১৪ আইটেম ডয়েজ ডিজেল ইঞ্জিন স্পেয়ার পার্টস কেনার ক্ষেত্রে এই নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হয়েছে। ১ কোটি টাকার বাজারমূল্যের মালামাল ৮ কোটি টাকায় কেনা দেখিয়ে সরকারের ৭ কোটি টাকা ক্ষতি করা হয়েছে। অতিরিক্ত মূল্যে কেনার মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত এই অর্থ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও রেলওয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়েছে মর্মে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সরঞ্জাম বিভাগ থেকে তিনটি ই-জিপি টেন্ডার আইডির মাধ্যমে এই কেনাকাটা করা হয়।

অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে চারটি টেন্ডারের নথি চেয়ে চিঠি দিয়েছে।

দুদকের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে যে বিষয়গুলো চাওয়া হয়েছে সেগুলো হলো–দরপত্র পদ্ধতি অনুমোদনের পরিপত্র; বাজারদর এবং অনুমোদিত দাপ্তরিক প্রাক্কলনের চিঠি; বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা; দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন; কৃতকার্য দরদাতার ট্রেড লাইসেন্স, দরদাতার আয়কর-ভ্যাট-জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সাধারণ অভিজ্ঞতার সনদপত্র।

কৃতকার্য দরদাতাকে দেওয়া রেলওয়ের স্বীকৃতিপত্র (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড), চুক্তিপত্র ও মালামাল সরবরাহসংক্রান্ত সব তথ্যসহ যাবতীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত অনুলিপি চেয়েছে দুদক।

নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তথ্য সরবরাহ না করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরের কাগজ। তাকে ফোন করা হয়; বার্তা পাঠানো হয় হোয়াটসঅ্যাপে। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। 

রেলওয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০২৩ সালে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে রেলের কেনাকাটায় ৭ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগে অনুসন্ধান চালায় দুদক। ২০২৪ সালে একই কার্যালয় অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ কিনে সরকারের দেড় কোটি টাকা অপচয় করেছে বলে পরিবহন অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠছে তিন বছর ধরে। ২০২৪ সালে লিফটিং জ্যাক, ড্রিলিং মেশিন ও কাটিং জ্যাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে ১ কোটি ৮১ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে ১৭-১৮ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করার অভিযোগও এসেছে অডিট প্রতিবেদনে। এ ছাড়া পণ্যের বাজারমূল্য নির্ধারণে অনিয়ম, টেন্ডারে জালিয়াতির অভিযোগে চট্টগ্রাম জেলা দুদক কার্যালয় একাধিকবার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কার্যালয়ে (সিআরবি) অভিযান পরিচালনা করেছে।

রেলের অভ্যন্তরীণ তদন্তে একাধিক কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 
সার্বিক বিষয়ে জানতে ও কথা বলতে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিনের দপ্তরে যাওয়ার অনুমতি চান এই প্রতিবেদক। তবে তিনি সাড়া দেননি।

ব্যবস্থাপনার সংকটে ডুবছে ঢাকা

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২২ এএম
ব্যবস্থাপনার সংকটে ডুবছে ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে আবারও নগর ব্যবস্থাপনার সংকট সামনে এসেছে। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি–অসংখ্য এলাকা গত শনি ও রবিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে তলিয়ে ছিল। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় পানি নামতে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও নগরজীবনে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় বিভিন্ন সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে, তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে, কোথাও আবার চুরি হয়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

রাজধানীর এই বেহাল অবস্থার জন্য শুধু অতিবৃষ্টিকে দায়ী করছেন না সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরাও। বরং তারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, খাল দখল, নদী ভরাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নগর পরিচালনায় দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতাই জলাবদ্ধতাকে ভয়াবহ করে তুলেছে। যদিও সমস্যা চিহ্নিত হলেও সমাধানে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো করেননি। 

এর আগে গত শুক্র-শনি-রবিবারের টানা বৃষ্টিতে হাজারও পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদেরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল পানিতে বিকল হয়ে পড়ে।

এসব বিষয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক সেমিনারে রাজধানীর জলাবদ্ধতার কারণ ও নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে রাজধানীর জলাবদ্ধতার দুটি প্রধান কারণ উঠে আসে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাল-নদী দখল। জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ঢাকার প্রাকৃতিক খাল দখল ও ভরাট হওয়ার কারণেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যেসব খাল এখনো টিকে আছে, সেগুলো উদ্ধার, পরিষ্কার এবং নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। 

মন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘তুরাগ নিয়মিতভাবে দখলের শিকার হয়েছে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ দখলমুক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। এই নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে ঢাকা শহরকেও রক্ষা করা সম্ভব হবে না!’ 

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যে দীর্ঘদিন থাকা সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বয়হীনতার সংকট রয়েছে। তার ভাষায়, সিটি করপোরেশনগুলোকে আরও স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সময়ের দাবি। রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশসহ নগর উন্নয়নে নিয়োজিত সব সংস্থাকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় না আনলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো সাময়িক বা মৌসুমি সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজব্যবস্থা এবং অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলই এখন প্রতি বর্ষায় ভয়াবহ আকারে দেখা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একসময়ে রাজধানীর বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার। কিন্তু দখল ও ভরাটের কারণে অধিকাংশ খাল স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। কোথাও খাল সংকুচিত হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ও পলিতে ভরে গেছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টানা জলাবদ্ধতায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক সড়কের কার্পেটিং উঠে খোয়া ছড়িয়ে পড়েছে এবং ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

বাড্ডা লিংক রোডের একটি অংশ ধসে লেকে পড়ে গেছে। এ ছাড়া নিকেতন, মহানগর প্রজেক্ট, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, হাতিরপুল, রাজাবাজার, মীরবাগ, বংশাল, কদমতলীর পাটেরবাগ ও কোদারবাজার এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা অংশের সার্ভিস রোডও দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকার ধোলাইখালসংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে ওয়াসার পুরোনো পানির পাইপ ফেটে মাটি সরে যাওয়ায় সড়কের একটি অংশ ধসে পড়েছে। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

জলাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজধানীতে খোলা ম্যানহোলও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, রাজধানীর অসখ্য ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে। আবার কোথাও রাস্তা ভেঙে পড়ায় ম্যানহোলের ঢাকনা সহজে আলাদা হয়ে থাকছে, তা রিকশা-সিএনজিচালিত অটোচালকরা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এর আগে গত রবিবার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যায়। ওই সময় খোলা ম্যানহোলে এক পথচারী পানির স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার ধানমন্ডি, পান্থপথ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পুরান ঢাকার একাধিক এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা ছিল না–খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজব্যবস্থা চালু এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করার পাশাপাশি রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও অন্য সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকার নদী, খাল ও জলাশয়ের দখলদারদের তালিকা অনেক আগেই নদী রক্ষা কমিশন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের সহযোগী এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু বক্তব্য নয়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ইটিপি ছাড়া পরিচালিত কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীতীরের অননুমোদিত শিল্পকারখানা নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা জরুরি।

ড. আদিলের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে খাল-নদী দখল ও দূষণ বন্ধ হবে না। এর ফলে ঢাকার বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদীতে অন্ধকার নামলে শুরু হয় বালু লুট

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম
আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদীতে অন্ধকার নামলে শুরু হয় বালু লুট
সাঙ্গু নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলন/ সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী। দিনের বেলায় নদীর চারপাশ নীরব থাকলেও রাত হলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। অন্ধকার নামার পর থেকে ভোর পর্যন্ত নদী থেকে দেদার বালু উত্তোলন করা হয়। সেই বালু চলে যায় ভিটা ভরাট কিংবা সড়ক সংস্কারের কাজে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হুমকির মুখে পড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড় ও চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নে সাঙ্গু নদীর বিভিন্ন অংশে রাতের আঁধারে ইঞ্জিনচালিত বোটের ওপর শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় নদীর চর কেটে বালু লুট করে ডাম্প ট্রাকে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। 

সরেজমিনে ধোপাছড়ি বাজার, শঙ্খরকুল, বড়খোলা, পুরানগড় নতুনহাট, শীলঘাটা, বৈতরণি, কালীনগর ও লতাবুনিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় রাতের আঁধারে সাঙ্গু নদী থেকে বালু উত্তোলন করে ভিটা ভরাটের পাশাপাশি সড়ক সংস্কারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত শ্যালো মেশিন স্থাপন করা ইঞ্জিনচালিত বোটগুলো তীরেই বেঁধে রাখা হয়েছে। আবার নদীর বেশ কয়েকটি অংশে ভেকুর সাহায্যে ২০ থেকে ২৫ ফুট গভীর গর্ত করে চরের বালু অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ধোপাছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা ওমর ফারুক বলেন, ‘দিনের বেলায় মানুষ পারাপার ছাড়া নদীতে তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না। তবে রাত গভীর হলে ড্রেজার, শ্যালো মেশিন, ভেকু ও ডাম্প ট্রাকের আনাগোনা বেড়ে যায়। বালু ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়ার ভয়ে স্থানীয়রা কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। এ ছাড়া আমাদের ইউনিয়নটি উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।’

পুরানগড় ইউনিয়নের বৈতরণি এলাকার মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘মাঝেমধ্যে নদীর এপারে বোটের ওপর শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে ভিটা ভরাট করা হয়। তবে নদীর ওপারে প্রায় সময় রাতের আঁধারে ভেকুর সাহায্যে চর কেটে বালু লুট করা হয়। ওই সময় ভেকু ও ডাম্প ট্রাকের বিকট শব্দে ঘুমানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’

দোহাজারী পৌরসভার দিয়াকুল গ্রামের যুবক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে বালু উত্তোলন চলছে। এতে নদীর তীর ভাঙনের পাশাপাশি বসতভিটাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের আশঙ্কা আরও বেড়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ 

স্থানীয় নদী সংরক্ষণ কর্মী নাছির উদ্দিন বলেন, নদী থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এভাবে বালু তুললে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এ ছাড়া নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নদী ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট। বালু উত্তোলনের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।’

চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পাওয়ার পর গ্রামপুলিশ পাঠিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়েছে। ধোপাছড়ি এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সার্বক্ষণিক তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

‘আমাগো খবর কেউ রাখে না’ শ্রাবণে কী হবে কড়াইল বস্তিবাসীর!

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:১০ এএম
আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:১২ এএম
শ্রাবণে কী হবে কড়াইল বস্তিবাসীর!
ছবি: খবরের কাগজ

‘আষাঢ়ই শেষ হয় নাই। শাওন (শ্রাবণ) মাসের বৃষ্টি তো এহনো বাকি। এক-দুই দিন পরই শাওন মাস শুরু হইব। টিভি-পত্রিকা আর ফেসবুক-ইউটুবে (ইউটিউব) তো কেবল মেইন রোডে জমা পানি দেখায়। প্রাইভেট কারের চাক্কা ডুবে গেল–সেটা দেখায়। কিন্তু আমরার বস্তিঘরে যে আড়াই ফুট পানি, সেটা দেখায় না। আমাগো খবর কেউ রাখে না।’

এভাবেই নিজেদের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে অসন্তোষ জানাচ্ছিলেন সাইফুল ইসলাম। গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর কড়াইল বস্তির গুদারা এলাকায় কথা হয় তার সঙ্গে। জানালেন ঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় স্ত্রী ও সন্তানদের অন্য বস্তিতে আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন।

বস্তির বেলতলা এলাকার মো. চাঁদ মিয়াসহ অন্যরাও বললেন, রবিবার (১২ জুলাই) সকালে এখানকার ঘরগুলোতে আড়াই ফুটের মতো বৃষ্টির পানি জমে ছিল। গতকাল বেলা সোয়া তিনটার দিকে বস্তিতে কথা হয় তার সঙ্গে। এ সময় কেউ কেউ তখনো ঘরে জমে থাকা ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি পরিমাণ পানি সেচে গলির দিকে ফেলছিলেন। 

আবার  কোনো  কোনো ঘর লোকশূন্য। ভেতরে খাটসহ কিছু আসবাবপত্র আছে। পানিতে ভাসছে সাংসারিক জিনিসপত্র। ঘরে কেউ না থাকার কারণ অন্যরা জানালেন, সন্তানদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে রেখে মা গেছেন বাসা-বাড়ির নিয়মিত কাজে, বাবা গেছেন রিকশা চালাতে, কারণ সংসার তো চালাতে হবে, কাজ ধরে রাখতে হবে।

বউ বাজার এলাকায় কথা হয় জুকরুপা খাতুনের সঙ্গে। জানালেন, তিনি পাশের এলাকা বনানীর একটি বেসরকারি অফিসে ধোয়া-মোছার কাজ করেন। টানা বৃষ্টির কারণে অফিসেও এখন ‘মোছামুছির’ কাজ বেশি। তাই অফিসে ছুটি চাওয়ার মতো পরিস্থিতি নাই, বরং এখন বাড়তি কাজ করতে হচ্ছে। অথচ তার বাসায় এখনো ‘চার-ছয় আঙুল’ পরিমাণ পানি। সেচে জমা পানিটুকু ফেলে দিতে পারলে ঘর শুকিয়ে যেত। সাংসারিক জিনিসপত্র যা নষ্ট হয়েছে, বাকিটা রক্ষা করা যেত।

কড়াইল বস্তিতে অবস্থিত গোডাউন বস্তির আখলাক মিয়া বললেন, ‘ইউটিউব আর টিভিতেই কেবল দেখি মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেছে। কিন্তু আমাদের এখানে কাউরে তো সহযোগিতা পাইতে শুনলাম না।’

বাইদার বস্তির সোলেমান মুন্সি বললেন, ‘কাইলকার (রবিবার) পানি তো আইজকা নাইমা গেল। কিছু কিছু বাকি। কিন্তু আইজকা যদি আবার ওই রকম বৃষ্টি অয়, তয় কী অইব!’

এরশাদনগরের খুরশিদা বেগম টিনের চালে বাঁধা দড়িতে ভেজা কাপড় ছড়াতে ছড়াতে জানালেন, কড়াইল বস্তিতে তিনি ২২ বছর ধরে আছেন। বললেন, এখানে ‘আজাব, আর মাইনষ্যের আগুন’ কখন যে শুরু হয়, তার ঠিক নাই। ব্যাখ্যা করে বললেন, হঠাৎ বৃষ্টিতে ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। পাকা বাড়ির চেয়ে এখানে শীত-গরম সবই বেশি। আর কে যে কখন কোন কারণে বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দেয়, তার ঠিক নাই। ‘কয় আগুন লাইগা গেছে।’

ভাসমান ছেঁড়া স্যান্ডেলে ইঁদুরের আশ্রয়: যেন বন্যার্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম
ভাসমান ছেঁড়া স্যান্ডেলে ইঁদুরের আশ্রয়: যেন বন্যার্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি
ছেঁড়া স্যান্ডেলে ইঁদুর যেন বন্যার্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি। ছবি: খবরের কাগজ

চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও নেই এক চিলতে শুকনো মাটি। সেই উত্তাল পানির মাঝখানে ভাসছে একটি ছেঁড়া স্যান্ডেল। আর সেই স্যান্ডেলের ওপর ভিজে জবুথবু হয়ে বসে আছে একটি ইঁদুর। যেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে প্রাণপণ চেষ্টা করছে প্রাণীটি।

গত রবিবার রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় এ দৃশ্য দেখা যায়। এ যেন দুর্যোগে টিকে থাকার অবিরাম সংগ্রামের প্রতীক। বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। পানিতে ডুবে গেছে সড়ক, অলিগলি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নয়। তবে এই দুর্যোগের আরেকটি নীরব অধ্যায় হচ্ছে অসংখ্য পশুপাখি ও ছোট ছোট প্রাণীর দুর্ভোগ। ধারণা করা যায়, পানির তোড়ে অনেক প্রাণীর আশ্রয়স্থল ভেসে গেছে, নষ্ট হয়েছে খাদ্যের উৎস। নিশ্চয়ই কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, পাখি থেকে শুরু করে অসংখ্য ছোট-বড় প্রাণী নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছে। অনেকেই হয়তো বাঁচতে পারছে না, আবার কেউ কেউ একটি ভাসমান কাঠ, প্লাস্টিক কিংবা এই ছবির ইঁদুরটির মতো একটি ছেঁড়া স্যান্ডেলকে জীবন রক্ষার শেষ অবলম্বন বানিয়েছে। 

ছেঁড়া স্যান্ডেলের ওপর ইঁদুরের বসে থাকার দৃশ্যটি দুর্যোগে আশ্রয়হীন মানুষের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। যাদের অনেকেই এখন একটি উঁচু জায়গা, একমুঠো শুকনো খাবার কিংবা মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় দিন পার করছেন। প্রকৃতির এই নির্মম সময়ে ছবিটি যেন একটাই বার্তা দেয় বেঁচে থাকা মানেই সংগ্রাম। আর সেই সংগ্রামে মানুষ ও প্রাণী, উভয়েই আজ একই স্রোতের যাত্রী।