টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে আবারও নগর ব্যবস্থাপনার সংকট সামনে এসেছে। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি–অসংখ্য এলাকা গত শনি ও রবিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে তলিয়ে ছিল। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেক এলাকায় পানি নামতে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও নগরজীবনে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় বিভিন্ন সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে, তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে, কোথাও আবার চুরি হয়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
রাজধানীর এই বেহাল অবস্থার জন্য শুধু অতিবৃষ্টিকে দায়ী করছেন না সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরাও। বরং তারা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, খাল দখল, নদী ভরাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নগর পরিচালনায় দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতাই জলাবদ্ধতাকে ভয়াবহ করে তুলেছে। যদিও সমস্যা চিহ্নিত হলেও সমাধানে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো করেননি।
এর আগে গত শুক্র-শনি-রবিবারের টানা বৃষ্টিতে হাজারও পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নিচতলার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদেরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল পানিতে বিকল হয়ে পড়ে।
এসব বিষয়ে গতকাল বুধবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক সেমিনারে রাজধানীর জলাবদ্ধতার কারণ ও নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে রাজধানীর জলাবদ্ধতার দুটি প্রধান কারণ উঠে আসে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং খাল-নদী দখল। জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ঢাকার প্রাকৃতিক খাল দখল ও ভরাট হওয়ার কারণেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যেসব খাল এখনো টিকে আছে, সেগুলো উদ্ধার, পরিষ্কার এবং নদীর সঙ্গে পুনঃসংযোগ করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
মন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘তুরাগ নিয়মিতভাবে দখলের শিকার হয়েছে। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ দখলমুক্ত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। এই নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারলে ঢাকা শহরকেও রক্ষা করা সম্ভব হবে না!’
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যে দীর্ঘদিন থাকা সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বয়হীনতার সংকট রয়েছে। তার ভাষায়, সিটি করপোরেশনগুলোকে আরও স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সময়ের দাবি। রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশসহ নগর উন্নয়নে নিয়োজিত সব সংস্থাকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় না আনলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো সাময়িক বা মৌসুমি সমস্যা নয়। বছরের পর বছর ধরে খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ড্রেনেজব্যবস্থা এবং অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলই এখন প্রতি বর্ষায় ভয়াবহ আকারে দেখা দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একসময়ে রাজধানীর বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার। কিন্তু দখল ও ভরাটের কারণে অধিকাংশ খাল স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। কোথাও খাল সংকুচিত হয়েছে, কোথাও ময়লা-আবর্জনা ও পলিতে ভরে গেছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টানা জলাবদ্ধতায় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক সড়কের কার্পেটিং উঠে খোয়া ছড়িয়ে পড়েছে এবং ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।
বাড্ডা লিংক রোডের একটি অংশ ধসে লেকে পড়ে গেছে। এ ছাড়া নিকেতন, মহানগর প্রজেক্ট, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, হাতিরপুল, রাজাবাজার, মীরবাগ, বংশাল, কদমতলীর পাটেরবাগ ও কোদারবাজার এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা অংশের সার্ভিস রোডও দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। পুরান ঢাকার ধোলাইখালসংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে ওয়াসার পুরোনো পানির পাইপ ফেটে মাটি সরে যাওয়ায় সড়কের একটি অংশ ধসে পড়েছে। ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
জলাবদ্ধতার পাশাপাশি রাজধানীতে খোলা ম্যানহোলও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, রাজধানীর অসখ্য ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙে গেছে। আবার কোথাও রাস্তা ভেঙে পড়ায় ম্যানহোলের ঢাকনা সহজে আলাদা হয়ে থাকছে, তা রিকশা-সিএনজিচালিত অটোচালকরা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে গত রবিবার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যায়। ওই সময় খোলা ম্যানহোলে এক পথচারী পানির স্রোতে তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার ধানমন্ডি, পান্থপথ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পুরান ঢাকার একাধিক এলাকায় ম্যানহোলের ঢাকনা ছিল না–খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজব্যবস্থা চালু এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করার পাশাপাশি রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও অন্য সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ঢাকার নদী, খাল ও জলাশয়ের দখলদারদের তালিকা অনেক আগেই নদী রক্ষা কমিশন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের সহযোগী এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী সরকারি সংস্থাগুলোকে চিহ্নিত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু বক্তব্য নয়, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ইটিপি ছাড়া পরিচালিত কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীতীরের অননুমোদিত শিল্পকারখানা নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা জরুরি।
ড. আদিলের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকলে খাল-নদী দখল ও দূষণ বন্ধ হবে না। এর ফলে ঢাকার বাতাস, পানি ও মাটির দূষণ যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।