বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে বারবার নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে দলটি এখনও সঠিক পথেই রয়েছে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি দলের সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছেন। উদ্বোধনী ম্যাচেই তিনি হ্যাটট্রিক করেন এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার অবস্থানে রয়েছেন।
সেমিফাইনালে লা আলবিসেলেস্তেদের প্রতিপক্ষ ১৯৬৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড, যারা বিশ্বকাপের শেষ চারে খেলছে চতুর্থবারের মতো। ম্যাচের আগে দেখে নেওয়া যাক কীভাবে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছাল আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা ৩-০ আলজেরিয়া
৩৮ বছর বয়সে নিজের প্রভাব নিয়ে ওঠা সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে লিওনেল মেসি করেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করে তিনি আর্জেন্টিনাকে ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জিতিয়ে শিরোপা রক্ষার মিশনে দুর্দান্ত সূচনা এনে দেন।
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসের মোট ১৬টি বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ডে সমতা আনেন। পাশাপাশি বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়সী ফুটবলারও হন। ঘটনাচক্রে, বিশ্বকাপে তার প্রথম গোল করার ঠিক ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার দিনেই এই কীর্তি গড়েন তিনি।
মেসি ম্যাচের ১৭ মিনিটে প্রথম গোলটি করেন। রদ্রিগো ডি পলের দারুণ এক থ্রু বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে শক্তিশালী শট নেন তিনি। বলটি গোলরক্ষক লুকা জিদানের আঙুল ছুঁয়ে জালের ডান দিকের ওপরের কোণে জড়িয়ে যায়।
৬০ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন মেসি। এরপর নিকো গনসালেসের সঙ্গে বোঝাপড়ায় ১৬ মিনিট পর পূর্ণ করেন নিজের হ্যাটট্রিক।
আর্জেন্টিনা ২-০ অস্ট্রিয়া
মেসি আবারও বিশ্বকাপের রেকর্ড বই নতুন করে লিখলেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-০ জয়ে দুটি গোলই করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের নিশ্চিত করেন শেষ ৩২-এ জায়গা। পেনাল্টি মিস করলেও বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে নিয়ে যান মেসি। আর্জেন্টিনা ‘জে’ গ্রুপে টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়ে ছয় পয়েন্ট অর্জন করে।
প্রথম গোলটির কারিগর ছিলেন থিয়াগো আলমাদা। তিনি বল নিয়ে বক্সের দিকে এগিয়ে গিয়ে বাঁ পাশে থাকা ফাকুন্দো মেদিনাকে পাস দেন। পরে আলমাদা রিটার্ন পাসটি নিজের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে ছেড়ে দিলে ফাঁকায় থাকা মেসি শান্তভাবে বল জালে পাঠান।
দ্বিতীয় গোলটি আসে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে। জুলিয়ান আলভারেজের প্রথম শটটি গোলরক্ষক শ্লাগার ঠেকিয়ে দিলেও ফিরতি বল যায় মেসির কাছে। প্রথম শটটি ব্লক হলেও দ্বিতীয় চেষ্টায় ছয় গজ দূর থেকে নিচু শটে বল জালে জড়িয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
জর্ডান ১-৩ আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করে লিখলেন মেসি। জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারানো ম্যাচে তিনি টানা সাতটি বিশ্বকাপ ফাইনাল পর্বের ম্যাচে গোল করা প্রথম ফুটবলার হন। এদিন আর্জেন্টিনা মূলত দ্বিতীয় সারির দল নিয়েই মাঠে নেমেছিল।
১৯ মিনিটে জিওভানি লো সেলসো গোল করে এগিয়ে দেন আর্জেন্টিনাকে। ১২ মিনিট পর পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লাউতারো মার্তিনেজ। দ্বিতীয়ার্ধের ১০ মিনিটে জর্ডানের হয়ে একটি গোল শোধ করেন মুসা আলতামারি। তবে ৮০ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিক গোল তাকে টানা সাতটি বিশ্বকাপ নকআউট পর্বের ম্যাচে গোলের কীর্তি এনে দেয়। এর মাধ্যমে তিনি ফ্রান্সের জাস্ট ফন্তেইন ও ব্রাজিলের জর্জিনহোকেও ছাড়িয়ে যান।
আর্জেন্টিনা ৩-২ কেপ ভার্দে
অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ ব্যবধানে কেপ ভার্দেকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-এ ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে টুর্নামেন্টে প্রথমবার অংশ নেওয়া কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা এবং ম্যাচ শেষে দলটিকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্নও তৈরি হয়।
দুইবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে এবং দক্ষিণ আমেরিকার দলটির দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড, যা কেপ ভার্দের ডিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়, সেটিই ম্যাচের নিষ্পত্তি করে।
আর্জেন্টিনা ৩-২ মিসর
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর নাটকীয় ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও দারুণ প্রত্যাবর্তন করে মিসরকে ৩-২ ব্যবধানে হারায় আর্জেন্টিনা। দলের এই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা ছিলেন লিওনেল মেসি। শেষ বাঁশি বাজার পর স্বস্তির অশ্রু ঝরান তিনি।
শিরোপাধারীরা ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল এবং অবিশ্বাস্য বিদায়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যখন ম্যাচ শেষ হতে বাকি মাত্র ১১ মিনিট। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, মেসি এবং যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের গোল আর্জেন্টিনাকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখে।
আর্জেন্টিনা ৩-১ সুইজারল্যান্ড
অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে জুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোল ১০ জনের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে ৩-১ ব্যবধানে নাটকীয় কোয়ার্টার ফাইনাল জয় এনে দেয়।
মেসির আর্জেন্টিনা ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে। এই জয়ের পর আকাশি-সাদা জার্সিধারী সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে সৃষ্টি হয় উৎসবের আবহ, আর শেষ হয়ে যায় সুইজারল্যান্ডের রূপকথার মতো বিশ্বকাপ যাত্রা।
অনিক/