১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল থেকে শুরু করে ১৯৯৮ সালে ডিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারায় ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড– বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড লড়াই কখনোই নাটকহীন ছিল না। দীর্ঘ দুই যুগ পর যখন দুই দল আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে মুখোমুখি হবে, তখন তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসে যুক্ত হবে নতুন একটি অধ্যায়। ম্যাচটি শুরু হবে আজ (১৫ জুলাই) রাত ১টায়।
এটাই প্রথমবার, যখন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবেন। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ভরসা হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যাম।
পূর্বাভাস কী?
অপ্টার সুপার কম্পিউটারের হিসাব অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ইংল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনা ৩৮.৯ শতাংশ, আর আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা ৩৪.১ শতাংশ। মডেলটি আরও অনুমান করছে, ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ২৭ শতাংশ।
ভেন্যুকথা
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরের আটলান্টা স্টেডিয়াম, যা সাধারণত মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম নামে পরিচিত, সেখানে মুখোমুখি হবে দুই দল। এই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচের এটিই শেষ ম্যাচ। টুর্নামেন্টে স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা ৬৮,২৩৯ জন। খোলা-বন্ধ করা যায় এমন ছাদ এবং ৩৬০ ডিগ্রি হ্যালো ভিডিও ডিসপ্লে-সমৃদ্ধ এই স্টেডিয়ামটি ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন।
হেড-টু-হেড
দুই দল মোট ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। মুখোমুখি লড়াইয়ে ইংল্যান্ড এগিয়ে। তারা জিতেছে ৬টি ম্যাচ, আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩টি। বাকি ৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড: সর্বশেষ ৫ ম্যাচ
ইংল্যান্ড ৩-২ আর্জেন্টিনা (আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, ২০০৫)
ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা (বিশ্বকাপ ২০০২, গ্রুপপর্ব)
ইংল্যান্ড ০-০ আর্জেন্টিনা (আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ, ২০০০)
আর্জেন্টিনা ২-২ ইংল্যান্ড (টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনা ৪-৩, বিশ্বকাপ ১৯৯৮, শেষ ষোলো)
ইংল্যান্ড ২-২ আর্জেন্টিনা (চ্যালেঞ্জ কাপ, ১৯৯১)
বিশ্বকাপে হেড-টু-হেড
ফিফা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে। ইংল্যান্ড জিতেছে তিনবার, আর আর্জেন্টিনা জিতেছে দুবার। বিশ্বকাপে তাদের সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০০২ সালে। সেই গ্রুপপর্বের ম্যাচে ডেভিড বেকহামের প্রথমার্ধের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড।
ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা (২০০২)
আর্জেন্টিনা ২(৪)-২(৩) ইংল্যান্ড (১৯৯৮)
আর্জেন্টিনা ২-১ ইংল্যান্ড (১৯৮৬)
ইংল্যান্ড ১-০ আর্জেন্টিনা (১৯৬৬)
ইংল্যান্ড ৩-১ আর্জেন্টিনা (১৯৬২)
শিরোপা ও পদক
আর্জেন্টিনা তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী (১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২) এবং দক্ষিণ আমেরিকার রেকর্ড ১৬ বারের চ্যাম্পিয়ন। ইংল্যান্ড মাত্র একটি বড় শিরোপা জিতেছে– ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ। তারা কখনো ইউরো জিততে পারেনি, তবে দুবার রানার্সআপ হয়েছে।
আর্জেন্টিনার মূল খেলোয়াড় কারা?
আটটি গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের অন্যতম দাবিদার মেসিই এই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার সেরা খেলোয়াড়। শেষ ষোলো পর্যন্ত ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছেন এবং বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড বাড়িয়ে ২১-এ নিয়ে গেছেন। এ ছাড়া লাউতারো মার্টিনেজ করেছেন দুটি গোল। পাশাপাশি লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এনজো ফার্নান্দেজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
ইংল্যান্ডের মূল খেলোয়াড় কারা?
স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন এবং আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যাম সমানভাবে ইংল্যান্ডের সাফল্যে অবদান রেখেছেন। দুজনই করেছেন ছয়টি করে গোল। কেইন তার বেশির ভাগ গোল করেছেন গ্রুপপর্বে, আর নকআউট পর্বে উজ্জ্বল ছিলেন বেলিংহ্যাম। অ্যান্থনি গর্ডন ও বুকায়ো সাকা, যাদের তিনটি করে অ্যাসিস্ট রয়েছে, তারাও ইংল্যান্ডের আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও মার্ক গুহেয়িও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রেখেছেন।
আর্জেন্টিনা: শক্তি ও দুর্বলতা
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের ১.৭০ মিটার উচ্চতার জাদুকর মেসি, যিনি যখন সবচেয়ে কম প্রত্যাশা করা হয়, ঠিক তখনই জাদুকরী কিছু করে দেখাতে পারেন। ৩৯ বছর বয়সেও এবং নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেও এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড প্রমাণ করেছেন, তিনিই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে কার্যকর আক্রমণভাগের অস্ত্র।
বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা গ্রুপপর্বে শতভাগ সাফল্য নিয়ে এগিয়ে গেলেও নকআউট পর্বে তাদের অনুপ্রেরণাহীন পারফরম্যান্স শিরোপা ধরে রাখার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। শেষ ৩২-এ অপেক্ষাকৃত দুর্বল কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় খেলতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। পরের ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে দুই গোল পিছিয়ে থেকেও ফিরে এসে জিততে হয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও খেলতে হয়েছে পুরো ১২০ মিনিট।
তিনটি ম্যাচেই পরিষ্কার ফেবারিট থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ সময় আর্জেন্টিনা ছিল নিষ্প্রভ। শেষ মুহূর্তে তাদের আক্রমণভাগের শক্তিই তাদের উদ্ধার করেছে। প্রশ্ন হলো, তারা কি এভাবে ইংলিশ পরীক্ষায় পার পেয়ে যাবে?
ইংল্যান্ড: শক্তি ও দুর্বলতা
আর্জেন্টিনার মতো ইংল্যান্ডেরও সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ, বিশেষ করে কেইন এবং বেলিংহ্যাম জুটি। ৩২ বছর বয়সী অভিজ্ঞ কেইন এবং তার ২৩ বছর বয়সী সতীর্থ বেলিংহ্যাম পালাক্রমে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছেন। টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের ১৩ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে এই দুজনের পা থেকে।
তবে কিছু সময়ে ইংল্যান্ডকে এলোমেলোও দেখিয়েছে, আর রক্ষণভাগেও দেখা গেছে দুর্বলতার ছাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে তাদের জয়ে মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের মতো বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স দেখা যায়নি। এর পর কোচ টমাস টুখেল তাদের খেলার সমালোচনা করে বলেন, এটি ছিল ‘অগোছালো’, ‘যথেষ্ট গতিময় নয়’এবং ‘কৌশলগুলো ত্রুটি’-এ ভরা একটি পারফরম্যান্স।