কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়ে ঘেঁষে যখন কোনো উড়োজাহাজ আকাশে ওড়ে, তার ঠিক ১৬৫ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব সাক্ষী আজ নিথর, নিস্তব্ধ। যে সুরম্য মিনার থেকে দীর্ঘ ১৩৬ বছর ধরে ভেসে আসত শান্তির আজান, সেখানে আজ ঝুলছে তালা। বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠারও ৩৪ বছর আগে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদ (সাবেক গৌরীপুর জামে মসজিদ) আজ থমকে গেছে নিরাপত্তার বেড়াজালে। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মসজিদের প্রবেশদ্বার, থমকে গেছে শত বছরের চেনা প্রার্থনার সুর।
গত শুক্রবারও যেখানে শত শত মুসল্লির উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল জুমার নামাজ, ঠিক তার পরদিন শনিবার থেকেই বদলে যায় চেনা দৃশ্যপট। মসজিদের একমাত্র প্রবেশপথ কলকাতা বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটটি হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ জমিরউদ্দিন অত্যন্ত দুঃখের সাথে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, আমাদের আগে থেকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। হঠাৎ করেই প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তবে রানওয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে মসজিদটি স্থানান্তরের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, বিকল্প হিসেবে কাছাকাছি কোনো সুবিধাজনক ও প্রশস্ত জায়গা দেওয়া হবে। কিন্তু এভাবে হঠাৎ পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে, তা আমাদের কাম্য ছিল না।
আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা বিধিমালার কড়া নিয়মকেই এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এনেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, রানওয়ে থেকে যেকোনো স্থায়ী স্থাপনার দূরত্ব অন্তত ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ ঐতিহাসিক এই মসজিদটি রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে অবস্থিত। মসজিদটি বিমানবন্দরের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত জোনের ভেতরে পড়ে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স' (CISF) অতীতেও এই স্থাপনাটির অবস্থান নিয়ে একাধিকবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
আজ থেকে ১৩৬ বছর আগে, ১৮৯০ সালে যখন অবিভক্ত বাংলার আকাশে-বাতাসে ব্রিটিশ রাজত্বের ডামাডোল, তখন এই মসজিদটি গৌরীপুর জামে মসজিদ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ঠিক ৩৪ বছর পর, ১৯২৪ সালে প্রথম ডানা মেলে কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অর্থাৎ, বিমানবন্দর আসার অনেক আগে থেকেই এই মাটি ছিল প্রার্থনার, ছিল আত্মিক প্রশান্তির।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও ইতিহাসবিদদের মতে, একসময় অবিভক্ত বাংলার দূর-দূরান্ত, এমনকি বর্তমান বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অঞ্চল থেকেও মানুষ নদী-পথ পাড়ি দিয়ে এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসতেন। দেশভাগের পরও উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার হাজারো মুসল্লির আবেগ ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ছিল এই বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদ।
উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার নিয়মকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, আবার শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য আর মানুষের ধর্মীয় আবেগকে অবহেলা করাও যায় না। কলকাতা বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে মসজিদের স্থানান্তর হয়তো সময়ের দাবি, কিন্তু তা করতে হবে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে।
মুসল্লি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের এখন একটাই আকুল আবেদন—আইন ও নিরাপত্তার স্বার্থে তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, কিন্তু তাঁদের প্রাণের এই ঐতিহ্যকে যেন উপযুক্ত সম্মান দিয়ে একটি সুন্দর ও প্রশস্ত বিকল্প স্থানে দ্রুত পুনর্বাসিত করা হয়। রানওয়ের কাঁটাতারে যেন চিরতরে হারিয়ে না যায় ১৩৬ বছরের এক জীবন্ত ইতিহাস।